অনলাইন থেকে রাজপথে ককরোচ
ঘুণে ধরা ভারতের পরিবর্তন চায় জেন-জি
- যন্তর-মন্তরে ‘জনতার আদালত’: বিচার হবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর
- এক দিনেই ককরোচ দলের ফলোয়ার বেড়েছে ২ লাখ

অনলাইন থেকে রাজপথে সিজেপি- রয়টার্স
ঘুণে ধরা ভারতের পরিবর্তন চায় দেশটির কোটি কোটি জেন-জি। বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় কেলেঙ্কারি, অব্যাহত উচ্চ বেকারত্ব এবং বিভিন্ন সুযোগ ক্রমেই হাতছাড়া হওয়ায় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে তাদের। এসব বিষয়ে এতদিন বিক্ষিপ্তভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিল অনলাইনে। যার যার স্যোশাল প্ল্যাটফর্মে। এবার আরও চড়াও হয়ে উঠেছে ভারতের এ ‘শিকল ভাঙা’ প্রজন্ম। সুদিনের আশায় নেমেছে রাজপথে। জবাবদিহির এমন এক দাবি তৈরি করেছে, যা আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
তাদের মাথায় এখন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে ব্যঙ্গ করে ১৬ মে আত্মপ্রকাশ করা ‘ককরোচ (তেলাপোকা) জনতা পার্টির (সিজেপি) ছাতা। সেই শামিয়ানাতেই দিল্লির যন্তর-মন্তরে ‘জনতার আদালত’ বসিয়েছে জেন-জি। সেখানেই ‘বিচার’ হবে একের পর এক প্রশ্নফাঁসের দায়ে অভিযুক্ত দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের। কয়েক বছর ধরে একটু একটু করে ফুঁসে ওঠা ক্ষোভ এবার পরিণত হয়েছে বিস্ফোরণে। বোস্টন থেকে ছুটে এসেছেন দলনেতা অভিজিৎ দিপকে (৩০)। তার নেতৃত্বেই পদত্যাগ দাবি বিক্ষোভের মাধ্যমে ‘বিচার শুরু’ হয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর। ঠিক এই লক্ষ্য নিয়েই শনিবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা। কতটুকু সফল হবে, সেটা সময়ের হাতে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের জন্য আতঙ্কের বিষয় হলো— মাত্র ২১ দিনেই সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারী ২ কোটি ২৩ লাখ। শুক্রবার ছিল ২ কোটি ২১ লাখ। সেখোনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দলের মসনদে বসে থাকা বিজেপির ফলোয়ার এক কোটিও হয়নি এত বছরে। ৯৪ লাখ মাত্র!
বিশাল এই সমর্থক নিয়ে নিজের প্রজন্মের ক্ষোভকে কর্মসূচিতে রূপ দেওয়াই এখন একমাত্র লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটির এই স্নাতকের। আগের দিন শুক্রবার ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, ‘আমার বন্ধুবান্ধব ও পরিবার ভয় পাচ্ছে যে, বিমানবন্দরে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কিন্তু আর কতদিন আমি জেলের ভয় পাব? এই দেশ (ভারত) শুধু একটি দলের নয়, আমাদের সবার। এটা আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
এই প্রজন্মের ক্ষোভের আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে মেডিকেলসহ ভারতের উচ্চঝুঁকির বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা। যাতে সীমিতসংখ্যক আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করে লাখো শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যবস্থা প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং নানা বিতর্কে জর্জরিত। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং পরিবারগুলোকেও সন্তানদের ভবিষ্যতের আশায় সর্বস্ব বিনিয়োগ করতে হয়। যদিও সেই প্রতিশ্রুতি প্রায়ই অনিশ্চিত বলে মনে হয়।
পঙ্গু করে দেওয়া বেকারত্ব
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত। যেখানে ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ। বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটিরও বেশি।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বেশি শিক্ষিত, ডিজিটালি দক্ষ, আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে উচ্চাকাঙ্ক্ষার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে তারা। শ্রেণিকক্ষ, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সোপানে পরিণত হয়েছে। তবে আশাবাদের পাশাপাশি কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
২৫ বছর বা তার কম বয়সী স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। ২০-২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ২০ শতাংশ চাকরিহীন। প্রতিবেদনে শিক্ষা থেকে বেকারত্বে রূপান্তরকে একটি ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে করা হয়েছে উল্লেখ।
মূল্যস্ফীতির চাপও অব্যাহত রয়েছে। ক্রমবর্ধমানসংখ্যক মানুষ মনে করছেন, ক্ষমতাসীনদের কাছে তারা উপেক্ষিত। এমন পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটেছে ককরোচ জনতা পার্টির। মিম সংস্কৃতিতে দক্ষতা এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মিশেলে মাত্র এক সপ্তাহে দলটি ২ কোটি ২০ লাখেরও বেশি অনুসারী অর্জন করেছে, যা তুলে ধরেছে তরুণদের ক্ষোভকে।
তাদের ভার্চুয়াল আরশোলা মাসকটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেগুলো দেশের সংবাদ চ্যানেল ও পত্রিকাগুলোয়ও স্থান পায়। এখন দলটি অনলাইনের ক্ষোভকে রাজপথে নিয়ে যেতে চায়।
গত ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য থেকেই ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম। অনেকেই তার মন্তব্যকে দেশের বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে আখ্যায়িত করা হিসেবে দেখেছিলেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, তিনি ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে কিছু পেশায় প্রবেশকারীদের কথা বলছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে বহু মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ।
কান্তের মন্তব্যের মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীকে জানানো হয়েছিল, তাদের ফলাফল বাতিল করা হবে। কারণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল।
পরীক্ষা-সংক্রান্ত ফাঁস ও বিতর্ক বর্তমান মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার বহু আগ থেকেই ছিল। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের হতাশা বাড়ছে ক্রমেই। স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাদান বললেন, ‘এই ফাঁসের ঘটনাগুলো অত্যন্ত হতাশাজনক। আমরা কম প্রতিযোগিতা চাই না; চাই ন্যায্য প্রতিযোগিতা।’
সরকারকে তিরস্কার: সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে এমন আন্দোলনের উত্থান দেখা গেছে, যা কথিত দুর্নীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিরুদ্ধে ছুড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ও পরের বছরে নেপালে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনে সরকার পতন তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
দীপকের ভাষ্য, ‘পাঁচ বছর আগে কেউ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে প্রস্তুত ছিল না। তবে এখন সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। তিনি দলের পক্ষে কথা বলার জন্য তিনজন আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নিয়োগ করেছেন। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ম্যাককিনসির সাবেক একজন কর্মী।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক সৌরভ দাস বলছিলেন, ‘আমরা একটি তরুণ রাজনৈতিক আন্দোলন এবং আমাদের দাবি একটাই— ব্যবস্থায় জবাবদিহি থাকতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এত পচন জমেছে যে, মানুষ এ নিয়ে খুবই সোচ্চার।’ দাস ভারতের বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে অবনতিশীল অবস্থান এবং মোদিকে ইঙ্গিত করে জানিয়েছেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে একবারও একক সংবাদ সম্মেলন করেননি তিনি।






