গালিবাফ-আরাঘচিকে হত্যার ষড়যন্ত্র ইসরায়েলের, ইরানকে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও আব্বাস আরাঘচি। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের শীর্ষ আলোচকদের লক্ষ্য করে হত্যার পরিকল্পনা করতে পারে ইসরায়েল—এমন আশঙ্কা করছিল ওয়াশিংটন। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর লক্ষ্য নিয়ে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হত্যার ঝুঁকি এতটাই গুরুতর ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠায়।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে জানানো হয়, ইসরায়েল তাদের শীর্ষ আলোচকদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, আপনি যদি এই ব্যক্তিদের হত্যা করেন, তাহলে আপনি বাস্তববাদী মধ্যস্থতাকারীদেরই সরিয়ে দিচ্ছেন।
আরেক কূটনীতিক জানিয়েছেন, মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক পথ খোঁজা শুরু করার পর থেকেই ইসরায়েলকে বারবার বলা হয়েছিল, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে অভিযান না চালাতে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইসরায়েলকে সতর্ক করেই থেমে থাকেনি, বরং ইরানকেও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আগাম সতর্ক করেছে। এতে ওয়াশিংটন-তেলআবিব সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত প্রভাবও সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা অ্যারন ডেভিড মিলার বলেছেন, এটি দেখায়, যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, ইসরায়েলি নেতৃত্ব যেকোনো মূল্যে আলোচনার প্রক্রিয়া ভেস্তে দিতে চায়—এটি সেটাই প্রমাণ করে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট চান শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাক।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসও ইসরায়েলের সম্ভাব্য এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে রিপোর্ট করেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই সময় ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দেয়।
যুদ্ধের শুরুতে দুই দেশের লক্ষ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে আসে, তেহরানের নেতৃত্ব দ্রুতই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এরপরই দুই মিত্র দেশের কৌশলে ভিন্নতা স্পষ্ট হয়।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ কর্মকর্তা আলী লারিজানিকে হত্যা করার পর সেই মতপার্থক্য আরও গভীর হয়।
এক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, মোড় ঘুরেছিল সর্বোচ্চ নেতাকে নয়, লারিজানিকে হত্যার ঘটনায়।
তিনি আরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একজন আলোচনাযোগ্য ইরানি নেতৃত্ব খুঁজছিল, কিন্তু সেই পথ তখন আর খোলা থাকেনি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আব্বাস আরাঘচি ও মোহাম্মদ গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও একটি কাঠামোগত চুক্তির আলোচনায় প্রধান যোগাযোগের ব্যক্তি ছিলেন।
তবে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক চাপ ও লবিং গ্রুপগুলো এর বিরোধিতা শুরু করে।
তাদের মতে, এ ধরনের চুক্তি ইরানে শাসন পরিবর্তনের ইসরায়েলি কৌশলকে দুর্বল করে দেবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দিতে পারে।
মার্চে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দেন, ইসরায়েলের চলমান অভিযান আলোচনাকে জটিল করছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ব্যাপারটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তারা সবাইকে সরিয়ে দিচ্ছে। আমি চাই না তারা এসব মানুষকে হত্যা করুক।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তাদের আশঙ্কা করছেন যে এতে এমন একটি আরও কঠোর শাসনব্যবস্থা সামনে আসতে পারে, যা প্রতিশোধমূলক অবস্থান নিতে আরও আগ্রহী হবে।
এছাড়া ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে আরও বড় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।




