জাতিসংঘ রিপোর্ট, বিস্ফোরণ ও জঙ্গি পলায়ন
ইউরোপে সংকটে বাংলাদেশিরা

সংগৃহীত ছবি
নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়দা তাদের ‘নেটওয়ার্ক’ সম্প্রসারণ ও ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা করছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক রিপোর্টটি রীতিমতো কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটিকে ‘অনুমানভিত্তিক’ দাবি করে অস্বীকার করা হলেও, উদ্ভূত পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইউরোপে বসবাসরত বাঙালিদের ওপর। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সামাজিক পরিসরে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নানামুখী অস্বস্তিকর প্রশ্ন, ভিসা জটিলতা ও গভীর এক অনিশ্চয়তার।
আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস। ১০ আগস্ট প্রকাশিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৩৮তম এই নজরদারি প্রতিবেদন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই রিপোর্ট সরাসরি খারিজ করলেও, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মেট্রো স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বোমা উদ্ধার, সাভারে প্রেসার কুকার বোমা নিষ্ক্রিয়করণের পাশাপাশি মাদারীপুরের একটি মহিলা মাদ্রাসায় শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে চারজন গুরুতর আহত হন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে অস্ত্র ও বোমা উদ্ধারের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কারাগার থেকে চিহ্নিত উগ্রবাদীদের পালিয়ে যাওয়ার পর তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ঢেকে না রেখে কারাগারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রকৃত দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সরকারের অফিশিয়াল বক্তব্যের সঙ্গে তার বক্তব্য সাংঘর্ষিক হওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ এই কর্মকর্তার সত্য প্রকাশ ও পরবর্তীতে তাকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তথ্য গোপনের সংস্কৃতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
ফিনল্যান্ডের হেলসিংকিভিত্তিক সংগঠন ‘গ্লোবাল ডায়াসপোরা কমিউনিটি বাংলাদেশ’-এর ফাউন্ডার ও প্রেসিডেন্ট হোসাইন ইমাম পুরো বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশের ঐতিহাসিক ও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের সরকারবিরোধী সহিংসতার সুযোগ নিয়ে অনেক চিহ্নিত জঙ্গি কারাগার ভেঙে পালিয়ে যায়। এরপর ডক্টর মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হিযবুত তাহরীরের মতো নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানিসহ অনেক হাই প্রোফাইল জঙ্গির কারামুক্তি, যা আন্তর্জাতিক মহলের নজর এড়ায়নি।’
হোসাইন ইমাম আরও সতর্ক করে বলেছেন, ‘হোলি আর্টিজান হামলার পর বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার আকাশচুম্বী হয়েছিল, যা তৎকালীন সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। এবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্টের পর ইউরোপে নতুন করে পড়তে আসতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা আবারও ভয়াবহ ভিসা রিফিউজালের মুখোমুখি হবেন। পাশাপাশি শ্রম ও স্কিলড মাইগ্রেশন ভিসার ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামাজিক পরিসরে বাঙালিদের এখন প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট ফাহিম ফয়সাল অর্ণব নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে বর্তমানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা তো কাজের জায়গায় ও সামাজিক পরিসরে সমস্যায় পড়বেনই, পাশাপাশি যারা নতুন করে আসতে চাইছেন, তাদের ভিসা পাওয়ার হার একেবারে কমে যাবে। বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সামনে চরম অনিশ্চয়তা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন।’
এ বিষয়ে সুইডেনপ্রবাসী ফাতেমা তুজ জোহরা নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘দেশ থেকে ইদানিং এমন সব খবরের শিরোনাম আসছে, যা বিদেশের মাটিতে আমাদের অবস্থানকে দিন দিন কঠিন করে তুলছে। ইউরোপীয়দের সামাজিক আড্ডায় বাংলাদেশ এখন আবারও নেতিবাচক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।’
ফিনল্যান্ডের লাপ্পেনরান্তার কর্মসংস্থান দপ্তরের সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রাম ইনস্ট্রাক্টর মেডিয়াট্রিজ এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে আবারও আল-কায়দা ও অন্যান্য জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিস্তারের কথা আমরা শুনছি। বিষয়টি যেকোনো দেশের নাগরিকদের জন্য চরম আতঙ্কের। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের উচিত এখনই এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতা বাড়তে থাকলে তা ইউরোপে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক একত্রীকরণেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
ইউরোপের প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক সমাজের মতে, আন্তর্জাতিক অভিযোগগুলোকে ‘অনুমানভিত্তিক’ বলে উড়িয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকার যদি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে দৃশ্যমান স্বচ্ছতা ও সমন্বয় না বাড়ায়, তবে ইউরোপের মাটিতে সাধারণ প্রবাসীদের সম্মান, কাজের পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
রিপোর্ট যাই বলুক, চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে দেশের অভ্যন্তরীণ চিত্রও। গত এক মাসে রাজধানী ঢাকায় তাজা বোমা উদ্ধার, মাদারীপুরের একটি মহিলা মাদ্রাসায় বোমার বিস্ফোরণে চারজন আহত হওয়ার ঘটনা এবং জেলের ভেতর থেকে চিহ্নিত জঙ্গিদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণের সফলতার বিষয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এরই মধ্যে নিরাপত্তা ও জঙ্গি পলায়নের বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরায়—যা সরকারের অফিশিয়াল দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল—ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শককে (আইজি প্রিজনস) সশস্ত্র বাহিনীতে ফেরত পাঠানো ও প্রত্যাহার করার ঘটনা উগ্রবাদ ইস্যুতে সরকারের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।








