Agamir Somoy E-Paper
বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬
আগামীর সময়
১ টাকার শিক্ষক লুৎফর রহমান
বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় ইউরোপ

সুরমার পাড় থেকে টেমসের তীর, সিলেটিদের ব্রিটেন জয়ের গল্প

ইরফান রহমান, যুক্তরাজ্য
agamir somoy
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১১:৩৪
সুরমার পাড় থেকে টেমসের তীর, সিলেটিদের ব্রিটেন জয়ের গল্প

টেমস নদী ও সুরমা নদী।

পূর্ব লন্ডনের এক শীতের সন্ধ্যা। ব্রিক লেনের বাতাসে ভেসে আসে বিরিয়ানি, গ্রিলড কাবাব, সাতকরার গরুর মাংস আর সদ্য বানানো নানের ঘ্রাণ... যেন স্মৃতি পাড়ি দিয়েছে সমুদ্র। দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা শব্দ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রবীণেরা কথা বলেছেন সিলেটি ভাষায়। তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা অনায়াসে বদলে ফেলেন ভাষা: ইংরেজি, সিলেটি, আর লন্ডনের নিজস্ব তরুণ উচ্চারণ।

কয়েক মাইল দূরে টাওয়ার হ্যামলেটস, হোয়াইটচ্যাপেল কিংবা নিউহ্যামেও একই দৃশ্য। ব্রিটেন তাঁদের ঘর, কিন্তু পরিবার, খাবার, মসজিদ, রেমিট্যান্স, বিয়ে আর স্মৃতির ভেতর আজও বেঁচে আছে সিলেট।

এ শুধু পাসপোর্ট আর জাহাজের নথিতে লেখা কোনো যাত্রার গল্প নয়। এটি নদী, রান্নাঘর, নামাজঘর, রেমিট্যান্সের রসিদ আর ঘর ছেড়ে যাওয়া মানুষের নীরব সাহসের ইতিহাস–যারা নিজের জীবনকে কঠিন পথে ঠেলে দিয়েছিলেন, যেন পরের প্রজন্ম আরও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ব্রিটেনে সিলেটিদের অভিবাসনের ইতিহাস শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাড়ি জমানো মানুষের গল্প নয়। এটি সাম্রাজ্য, জাহাজ, শ্রম, বর্ণবাদ, টিকে থাকা, পরিবার, ব্যবসা ও পরিচয়ের গল্প। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেওয়ার বহু আগে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তা বড় আকার নেয়, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের দরকার ছিল শ্রমিক, আর সিলেটের মানুষের দরকার ছিল কাজ ও সুযোগ। পরে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার যুক্ত হলে এই অভিবাসন স্থায়ী বসতিতে রূপ নেয়। আজ ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা যুক্তরাজ্যের অন্যতম দৃশ্যমান দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী। তাঁদের বড় অংশের শিকড় সিলেট অঞ্চলে–এ কথা ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাসে প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্য।

এই দীর্ঘ যাত্রাকে মোটামুটি তিনটি বড় পর্বে দেখা যায়। প্রথমত, লস্কর ও জাহাজি শ্রমিকদের সামুদ্রিক অভিবাসন; দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তরুণ পুরুষ শ্রমিকদের ব্রিটেনে যাওয়া; তৃতীয়ত, পরিবার পুনর্মিলন, ব্যবসা বিস্তার এবং দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের উত্থান–যার মাধ্যমে অস্থায়ী শ্রমিকসমাজ ধীরে ধীরে স্থায়ী ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটিতে পরিণত হয়।

প্রথম যাত্রা: জাহাজ, সাম্রাজ্য ও লস্করদের জীবন
বঙ্গ, সিলেট ও ব্রিটেনের প্রাচীন সম্পর্ক গড়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সংযোগের ভেতর দিয়ে। সপ্তদশ শতক থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানিগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক নাবিক নিয়োগ করত। তাঁদের বলা হতো লস্কর। এরা কাজ করতেন এমন সব জাহাজে, যা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকাকে বাণিজ্যের সুতায় যুক্ত করেছিল।

লস্করদের অনেকেই আসতেন নদীমাতৃক অঞ্চল ও বন্দরসংলগ্ন সমাজ থেকে। বঙ্গ ছিল সেই সামুদ্রিক শ্রমবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলকাতা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে নদীপথে যুক্ত সিলেট ধীরে ধীরে এই শ্রম সরবরাহের পথে ঢুকে পড়ে।

অনেক সিলেটির জন্য ব্রিটেনযাত্রা বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়নি; শুরু হয়েছিল নদী থেকে।

বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, জগন্নাথপুর, নবীগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জসহ নানা এলাকার তরুণেরা গ্রাম ছেড়ে নৌকা, রেল আর জাহাজের পথে পৌঁছাতেন ঔপনিবেশিক বন্দরে। কেউ কাজ করতেন জাহাজের বাবুর্চি হিসেবে, কেউ ফায়ারম্যান, কেউ ডেকহ্যান্ড, কেউ ইঞ্জিনরুমের শ্রমিক। সিলেটে তাঁদের বলা হতো ‘জাহাজি’।

একালের বিমানবন্দর হতে বিদায় দেওয়ার মুহূর্ত কিংবা ছাত্রভিসার যুগের বহু আগেই ছিল জাহাজের যুগ। ব্রিক লেন ‘বাংলাটাউন’ হওয়ার বহু আগে সুরমা ও কুশিয়ারার পাড়ের তরুণেরা গ্রামের ভেজা মাটির গন্ধ আর সকালবেলার স্মৃতি বয়ে নিয়ে দাঁড়াতেন ব্রিটিশ ডকের ঠান্ডা বাতাসে।

এই প্রাথমিক অভিবাসীরা পর্যটক ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সাম্রাজ্যিক অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন শ্রমক্ষেত্রের কর্মী। কম মজুরি, খারাপ থাকার ব্যবস্থা, বর্ণবাদী আচরণ, এমনকি ব্রিটিশ বন্দরে পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁদের অনেকের জীবনের অংশ ছিল। কেউ ফিরে গেছেন দেশে, কেউ থেকে গেছেন লন্ডন, কার্ডিফ, লিভারপুলসহ নানা বন্দরনগরে। ১৮৫৭ সালে লন্ডনে চালু হওয়া ‘স্ট্রেঞ্জারস হোম ফর এশিয়াটিকস, আফ্রিকানস অ্যান্ড সাউথ সি আইল্যান্ডারস’ ছিল এমন এক প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে ব্রিটেনে আটকে পড়া অ-ইউরোপীয় নাবিকদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি ইতিহাসে আয়ুব আলী মাস্টার ও শাহ আবদুল মজিদ কুরেশির মতো ব্যক্তিদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। তাঁরা দুজনই সিলেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং লন্ডনের প্রাথমিক বাঙালি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। আয়ুব আলী মাস্টারের ঘর ও যোগাযোগের পরিসর বহু জাহাজি ও নতুন আগন্তুকের জন্য আশ্রয়, কাগজপত্রের সহায়তা এবং পরিচিত মানুষের সন্ধান দিয়েছিল। শাহ আবদুল মজিদ কুরেশি যুক্ত ছিলেন লন্ডনের প্রাথমিক রেস্তোরাঁ ও কমিউনিটি কার্যক্রমের সঙ্গে। তাঁদের প্রজন্মই পরবর্তী আগন্তুকদের জন্য ব্রিটেনকে পরিচিত করে তুলেছিল।
প্রথম পর্বে অভিবাসন ছিল প্রায় পুরোপুরি পুরুষনির্ভর, অস্থায়ী ও অনিশ্চিত। তখন ব্রিটেন পুরো পরিবারের গন্তব্য ছিল না। ছিল মজুরি, ঝুঁকি আর নিঃসঙ্গতার জায়গা।

পূর্ব লন্ডনের এক প্রবীণ সিলেটি অভিবাসী আতাউর রহমানের ভাষায়, “তাঁরা স্যুটকেস আর পরিকল্পনা নিয়ে আসেননি। এসেছিলেন সাহস নিয়ে, কখনো শুধু একটি জাহাজের চুক্তিপত্র আর লন্ডনে পরিচিত একজন মানুষের নাম নিয়েই।”

দ্বিতীয় পর্ব: যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেন ও শ্রমের খোঁজ
দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। যুদ্ধ শেষে ব্রিটেনকে নতুন করে গড়ে তুলতে শ্রমিকের দরকার ছিল। কারখানা, ফাউন্ড্রি, টেক্সটাইল মিল, পরিবহনব্যবস্থা ও রেস্তোরাঁ–সবখানেই দরকার ছিল সস্তা শ্রম। একই সময়ে গ্রামীণ সিলেট ছিল সীমিত জমি, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সুযোগের অভাবে জর্জরিত। বহু পরিবারের কাছে একজন ছেলেকে ব্রিটেনে পাঠানো হয়ে ওঠে টিকে থাকার কৌশল।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে সিলেটি পুরুষেরা বড় সংখ্যায় ব্রিটেনে আসতে শুরু করেন। তাঁদের অনেকেই বসতি গড়েন লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ওল্ডহ্যাম, ব্র্যাডফোর্ড, লুটন, বেডফোর্ড, রচডেল, লিডস, সান্ডারল্যান্ডসহ শিল্পনগর ও শ্রমনির্ভর শহরে। লন্ডনে তাঁদের বড় অংশ চলে আসেন ইস্ট এন্ডে–স্পিটালফিল্ডস, হোয়াইটচ্যাপেল ও ব্রিক লেন এলাকায়। কারণ, সেখানে আগের বাঙালি নেটওয়ার্ক ছিল, আর তুলনামূলক কম খরচে থাকার সুযোগও ছিল।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনের বাংলা টাউনে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানী ক্যামিলাতাঁরা এসেছিলেন অল্প লাগেজ নিয়ে, কিন্তু বিপুল দায়িত্ব কাঁধে করে। তাঁদের পকেটে শুধু কাজের অনুমতিপত্র বা কোনো ঠিকানা ছিল না; ছিল টিনের ঘরকে পাকা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন, বোনের বিয়ে দেওয়ার চিন্তা, বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার দায়, আর তখনও জন্ম না নেওয়া সন্তানদের একদিন ভালো ভবিষ্যতের পথে হাঁটানোর আশা।

এই পুরুষেরা দীর্ঘ সময় কঠিন পরিবেশে কাজ করতেন। কেউ টেক্সটাইল বা গার্মেন্টস কারখানায়, কেউ ওয়েটার, কিচেন পোর্টার, বাবুর্চি, মেকানিক কিংবা ছোট ব্যবসায়ী হিসেবে। অনেকে থাকতেন গাদাগাদি করে; কখনো একই বিছানা ব্যবহার হতো পালা করে। তাঁদের জীবনের মূল শব্দ ছিল ত্যাগ: ব্রিটেনে আয় করা, সিলেটে টাকা পাঠানো, বাড়ি বানানো, বাবা-মাকে সহায়তা করা, ভাইবোনের বিয়ে দেওয়া এবং একদিন দেশে ফিরে যাওয়ার আশা রাখা।

কিন্তু ইতিহাস মোড় নেয় অন্যদিকে৷ অনেকেই আর স্থায়ীভাবে ফেরেননি। ধীরে ধীরে ব্রিটেনই হয়ে ওঠে ঠিকানা।

এই সময়ে ‘চেইন মাইগ্রেশন’ বা পরিচিতজনের হাত ধরে অভিবাসনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সিলেটি গ্রামের একজন মানুষ ব্রিটেনে গিয়ে পরে আনতেন চাচাতো ভাইকে, তারপর ভগ্নিপতিকে, তারপর পাড়া পড়শিদের। সময় গড়াতে থাকে, ব্রিটেনের নির্দিষ্ট শহরগুলোর সঙ্গে সিলেটের নির্দিষ্ট এলাকার সামাজিক যোগ তৈরি হয়। টাওয়ার হ্যামলেটসের সঙ্গে জগন্নাথপুর, বিশ্বনাথসহ নানা এলাকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে; অন্য শহরগুলোরও তৈরি হয় নিজস্ব সিলেটি নেটওয়ার্ক। অভিবাসন আর কেবল ব্যক্তিগত থাকেনি; হয়ে ওঠে সামাজিক ও সামষ্টিক।

এই কারণেই ব্রিটিশ বাংলাদেশি ইতিহাস এত গভীরভাবে সিলেটি। অন্য অনেক অভিবাসী জনগোষ্ঠী যেখানে একটি দেশের নানা অঞ্চল থেকে এসেছে, ব্রিটেনে বাংলাদেশি উপস্থিতি গড়ে উঠেছে মূলত একটি অঞ্চলের ঘন সংযোগের ওপর। সিলেট হয়ে ওঠে উৎসভূমি, আবার আবেগের রাজধানীও।

ব্রিক লেন: অভিবাসী পাড়া থেকে বাংলাটাউন

এই রূপান্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক ব্রিক লেন। লন্ডনের ইস্ট এন্ড বহুদিন ধরেই অভিবাসীদের এলাকা। হুগেনট, আইরিশ শ্রমিক, ইহুদি পরিবার এবং পরে বাংলাদেশিরা–সবাই একই রাস্তায় রেখে গেছে নিজেদের চিহ্ন। বর্তমানে ব্রিক লেন জামে মসজিদ নামে পরিচিত ভবনটিও এই বহুস্তরীয় ইতিহাসের সাক্ষী। একসময় ভবনটি খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল; পরে তা বাংলাদেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মসজিদে পরিণত হয়। ১৯৭০-এর দশকে ব্রিক লেন ও স্পিটালফিল্ডস এলাকায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে, তাঁদের বড় অংশই ছিলেন সিলেটি।

বিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিক লেন পরিচিতি পায় 'বাংলাটাউন' নামে। কারি হাউস, নিত্যপণ্যের দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি, মানি ট্রান্সফার ব্যবসা, ইসলামি বইয়ের দোকান, শাড়ির দোকান ও কমিউনিটি সংগঠন–সব মিলিয়ে এলাকাটি ব্রিটিশ বাংলাদেশি জীবনের দৃশ্যমান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। নতুন আগন্তুকদের জন্য ব্রিক লেন শুধু একটি বাণিজ্যিক রাস্তা ছিল না। ছিল তথ্যকেন্দ্র, কাজের খোঁজের জায়গা, সাংস্কৃতিক মিলনস্থল এবং মানসিক আশ্রয়।

এই ব্রিক লেন এক রাতে বাংলাটাউন হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে–একটি কারি হাউস, একটি নিত্যপণ্যের দোকান, একটি মসজিদ, একটি মানি ট্রান্সফার কাউন্টার, একজন ক্লান্ত শ্রমিক এবং একটি আশাবাদী পরিবারের হাত ধরে।

রেস্তোরাঁশিল্প হয়ে ওঠে সিলেটিদের অর্থনৈতিক উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি। ব্রিটেনজুড়ে বহু ‘ইন্ডিয়ান’ রেস্তোরাঁ আসলে পরিচালনা করতেন সিলেটি বাংলাদেশিরা। কারি হাউস হয়ে ওঠে কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটির অর্থনৈতিক ভিত্তি। এটি চাকরি তৈরি করেছে, সিলেটের পরিবারগুলোকে সহায়তা করেছে এবং ব্রিটিশদের দক্ষিণ এশীয় খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশিরা, বিশেষ করে সিলেটিরা, ব্রিটিশ কারি শিল্পের বড় অংশে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।

কিন্তু এই সাফল্যের দামও ছিল। রেস্তোরাঁর কাজ ছিল ক্লান্তিকর। গভীর রাত পর্যন্ত কাজ, সপ্তাহে ছয়-সাত দিন শ্রম–এটাই ছিল বহু মানুষের জীবন। অনেক সন্তান বড় হয়েছে বাবাকে খুব কম দেখে, স্নেহবঞ্চিত হয়ে। প্রথম প্রজন্ম শ্রম দিয়ে টিকে থাকার ব্যবস্থা করেছে; দ্বিতীয় প্রজন্ম পেয়েছে সুযোগ, কিন্তু পেয়েছে অনুপস্থিতির বেদনাও।

নরউইচের এক দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্রিটিশ সিলেটি সিরাজুল ইসলামের ভাষায়, “আমাদের বাবারা রেস্তোরাঁ, বাড়ি আর ভবিষ্যৎ বানিয়েছেন। কিন্তু এর দাম দিয়েছেন তাঁদের স্বাস্থ্য, ঘুম আর পুরো যৌবন ব্যয় করে।”

তৃতীয় পর্ব: পরিবার, বর্ণবাদ ও স্থায়ী বসতি

তৃতীয় পর্ব শুরু হয় যখন অভিবাসন আর একা পুরুষের যাত্রা থাকে না; পরিবার যুক্ত হতে থাকে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে অভিবাসননীতির পরিবর্তনের ফলে অনেক স্থায়ী পুরুষ তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের ব্রিটেনে নিয়ে আসেন, তা আরও কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার আগেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরিবার পুনর্মিলনের এই গতি আরও বাড়ে। নতুন আগমনকারীরা এই কমিউনিটিকে পুরুষ শ্রমশক্তি থেকে স্থায়ী বসতিতে রূপান্তরিত করেন।

নারী ও শিশুদের আগমনের পর অভিবাসন আর সাময়িক যাত্রা থাকেনি; তা হয়ে ওঠে ঘর। অবিবাহিত শ্রমিকদের নিঃসঙ্গ ঘর বদলে যায় পারিবারিক ফ্ল্যাটে। ভাগাভাগি বিছানার নীরবতার জায়গায় ভেসে আসে ভাত-তরকারির ঘ্রাণ। ব্রিটেনের ভেতর ধীরে ধীরে শোনা যেতে থাকে সিলেটের ঘরের শব্দ।
এই রূপান্তরে নারীদের ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়, যদিও অনেক সময় অদৃশ্য। তাঁরা ব্রিটিশ রাস্তা ও কাউন্সিল ফ্ল্যাটে সিলেটি পারিবারিক জীবন পুনর্গঠন করেছেন। অপরিচিত ভাষা ও পরিবেশে সন্তান বড় করেছেন, খাবার, ধর্ম, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার বন্ধন ধরে রেখেছেন। পুরুষেরা যখন রেস্তোরাঁ বা কারখানায় কাজ করেছেন, নারীরা ঘর, সন্তান ও সংস্কৃতির ভিত ধরে রেখেছেন। তাঁদের শ্রম ছিল কম দৃশ্যমান, কিন্তু তাঁদের ছাড়া স্থায়ী কমিউনিটি গড়ে উঠত না।

এই সময়টি বর্ণবাদ ও সহিংসতারও সময়। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশিরা বর্ণবাদী গোষ্ঠী ও উগ্র ডানপন্থীদের হামলার শিকার হন। ১৯৭৮ সালে গার্মেন্টস কর্মী আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ড ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক চেতনায় মোড় ঘোরানো ঘটনা হয়ে ওঠে। তাঁর মৃত্যু প্রতিবাদের ঢেউ তোলে এবং তরুণ বাংলাদেশিদের একটি প্রজন্মকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে। ইস্ট এন্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটি নিরাপত্তা, বাসস্থান ও মর্যাদার দাবিতে যুব সংগঠন, আন্দোলন ও স্থানীয় রাজনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলে।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম বাংলাদেশের কমিউনিটিকে জনজীবনের দিকে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশিরা বুঝতে শেখেন, ব্রিটেনে টিকে থাকতে শুধু কঠোর পরিশ্রম যথেষ্ট নয়; দরকার রাজনৈতিক কণ্ঠও।

সংখ্যায় ও বাস্তবে: আজকের ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা
আজ যে কমিউনিটির শুরু হয়েছিল লস্কর ও শ্রমিকদের হাত ধরে, তা ব্রিটেনের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বড় অংশ। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯০০ জন নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১ শতাংশ। স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডসহ যুক্তরাজ্যজুড়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশির সংখ্যা সাধারণভাবে সাড়ে ছয় লাখের বেশি বলে ধরা হয়।

পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেন, যা 'বাংলা টাউন' হিসেবে পরিচিত

লন্ডন এখনও ব্রিটিশ বাংলাদেশি জীবনের কেন্দ্র। ২০২১ সালে লন্ডনে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২২ হাজারের বেশি। এই ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, রেডব্রিজ, বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম এবং ক্যামডেনে। লন্ডনের বাইরে বড় কমিউনিটি রয়েছে বার্মিংহাম, ওল্ডহ্যাম, লুটন, ম্যানচেস্টার, ব্র্যাডফোর্ড, বেডফোর্ড, রচডেলসহ বিভিন্ন শহরে।

টাওয়ার হ্যামলেটস এখনও প্রতীকীভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বাংলাটাউন গড়ে উঠেছে, এখানে বাঙালি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, এখানে সিলেটিদের প্রাথমিক সংগ্রামের স্মৃতি সবচেয়ে দৃঢ়। নিউহ্যামও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। লন্ডনের বাইরে বার্মিংহাম বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অন্যতম বড় কেন্দ্র।

তবে সংখ্যা দিয়ে এই কমিউনিটির গুরুত্ব পুরোটা বোঝা যায় না। ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছেন। তাঁরা মসজিদ, স্কুল, রেস্তোরাঁ, গণমাধ্যম, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী চেম্বার, হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান, নিত্যপণ্যের ব্যবসা, কেয়ার ব্যবসা ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তাঁরা প্রবেশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় স্বাস্থ্য সার্ভিস (এনএইচএস), স্থানীয় কাউন্সিল, পার্লামেন্ট, সাংবাদিকতা, শিল্প, পুলিশ, শিক্ষকতা, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে।

কারি হাউস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
সিলেটি-ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর হলো প্রজন্মগত পরিবর্তন। প্রথম প্রজন্মের অনেকে এসেছিলেন অল্প শিক্ষায়, সীমিত ইংরেজি জ্ঞান নিয়ে। তাঁদের বড় অংশ কাজ করেছেন কম মজুরির কঠিন খাতে। কিন্তু তাঁদের সন্তানরা উচ্চশিক্ষায় ব্রিটিশ স্কুলের পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন সমৃদ্ধির শিখরে। আজ ব্রিটিশ বাংলাদেশি তরুণেরা পেশাগত জীবনের নানা ক্ষেত্রে ক্রমেই দৃশ্যমান।

প্রথম প্রজন্ম হাতে ধরেছিল রেস্তোরাঁর ট্রে ও কারখানার যন্ত্র; পরের প্রজন্ম হাতে ধরেছে বই, বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও পেশাগত স্বপ্ন। শ্রম থেকে শিক্ষায় এই নীরব হস্তান্তর ব্রিটিশ বাংলাদেশি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়গুলোর একটি।

শিক্ষা এই কমিউনিটির বড় সাফল্যের জায়গা। দারিদ্র্য, অতিরিক্ত ভিড়ের বাসস্থান ও সামাজিক চাপের মধ্যেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীরা ইংল্যান্ডে স্কুলশিক্ষায় ভালো ফলের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। শ্রেণিকক্ষ যেন হয়ে উঠেছে নতুন অভিবাসনের পথ–সিলেট থেকে লন্ডনে নয়, বরং ব্রিটিশ সমাজের প্রান্ত থেকে পেশাগত কেন্দ্রে যাওয়ার পথ।

তবে সাফল্য সমানভাবে আসেনি। কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রে এই কমিউনিটির এখনও আছে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশি পরিবারগুলো ঐতিহাসিকভাবে অতিরিক্ত ভিড়ের বাসস্থান ও দারিদ্র্যের সমস্যায় ভুগেছে। বিশেষ করে বয়স্ক নারী ও প্রথম প্রজন্মের কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের হার অন্যান্য অনেক গোষ্ঠীর তুলনায় কম। অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি এখনও এমন নগর এলাকায় থাকেন, যেখানে আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় সমস্যা।

এই দ্বৈত বাস্তবতাই বর্তমান সময়কে চিহ্নিত করে–একদিকে শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, অন্যদিকে কাঠামোগত বৈষম্য।

তরুণ ব্রিটিশ সিলেটি গ্র্যাজুয়েট রুহুল আমিন জানান, “আমাদের দাদা-নানারা জাহাজ আর কারখানা টিকে পার করেছেন। আমাদের বাবা-মায়েরা রেস্তোরাঁ টিকে পার করেছেন। আমাদের প্রজন্ম টিকে থাকার লড়াই করছে বাড়িভাড়া, শিক্ষাঋণ আর পরিচয়ের রাজনীতির ভেতর।”

রাজনীতি ও প্রতিনিধিত্ব
ব্রিটেনজুড়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। লেবার পার্টির সঙ্গে এই কমিউনিটির ঐতিহাসিক সম্পর্ক গভীর। শ্রমজীবী রাজনীতি, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন ও স্থানীয় সরকারকেন্দ্রিক সংগ্রাম এই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সিলেটের বিশ্বনাথে জন্ম নেওয়া রুশনারা আলী ২০১০ সালে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। রূপা হক, আপসানা বেগম, ফয়সল চৌধুরীও ব্রিটিশ বাংলাদেশি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পরিচিত মুখ।
স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশি কাউন্সিলর, মেয়র ও কর্মীরা টাওয়ার হ্যামলেটস, ক্যামডেন, নিউহ্যামসহ বিভিন্ন এলাকার রাজনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এই কমিউনিটি এখন আর শুধু ভোটব্যাংক নয়; এখান থেকে তৈরি হচ্ছে প্রার্থী, প্রচারকর্মী, উপদেষ্টা ও জননেতা।

তবে রাজনীতি এখন আগের চেয়ে জটিল। তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা সব সময় পুরোনো দলীয় আনুগত্য অনুযায়ী ভোট দেন না। ফিলিস্তিন, ইসলামোফোবিয়া, আবাসন, অভিবাসন, পুলিশিং, শিক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি তাঁদের রাজনৈতিক পছন্দকে প্রভাবিত করছে। কমিউনিটিও আগের চেয়ে বৈচিত্র্যময়–ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শিল্পী, অধিকারকর্মী ও শ্রমজীবী পরিবার–সবার অগ্রাধিকার এক নয়।

রেমিট্যান্সের সেতুবন্ধ
সিলেটের জন্য ব্রিটেনে অভিবাসন পুরো ভূদৃশ্য বদলে দিয়েছে। বহু গ্রামে ‘লন্ডনি বাড়ি’ সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ব্রিটেনের আয়ে তৈরি পাকা বাড়ি, জমি কেনা, সন্তানদের শিক্ষা, বিয়ে, মসজিদ, মাদ্রাসা, দাতব্যকাজ ও স্থানীয় ব্যবসা–সবকিছুর পেছনে ছিল প্রবাসী অর্থ। সিলেটের অর্থনীতি ও সামাজিক মর্যাদার কাঠামো গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে যুক্তরাজ্য-সংযোগে।

এই সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক ছিল না; ছিল আবেগেরও। বহু দশক ধরে সিলেটের পরিবারগুলো সময় মেপেছে চিঠি, ক্যাসেট বার্তা, ফোনকল, মানি ট্রান্সফার আর বিমানবন্দরে ফেরার অপেক্ষায়। লন্ডনের বাবা হয়তো মিস করেছেন সন্তানের শৈশব; সিলেটের মা হয়তো অপেক্ষা করেছেন বছরের পর বছর পুনর্মিলনের জন্য; ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া সন্তান হয়তো পৈতৃক গ্রামে গিয়ে একই সঙ্গে আপন ও অচেনা হয়ে থেকেছে।

এই আন্তঃদেশীয় পরিচয় এখনও শক্তিশালী। ব্রিটিশ সিলেটিরা প্রায়ই দুই ভূগোলের মধ্যে বাস করেন: দৈনন্দিন জীবনে ব্রিটেন, আবেগের উত্তরাধিকারে সিলেট।

ভাষা, ধর্ম ও পরিচয়
সিলেটি ভাষা ব্রিটিশ বাংলাদেশি পরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী চিহ্ন। অনেক ঘরে শিশুরা প্রমিত বাংলা নয়, সিলেটি শুনে বড় হয়। এখানে প্রবীণদের কাছে সিলেটি ভাষা হচ্ছে স্মৃতি, রসিকতা ও আপনত্বের জায়গা। তরুণদের কাছে এটি কখনও কখনও ফিকে হয়ে আসা উত্তরাধিকার–বোঝে, কিন্তু সব সময় সাবলীলভাবে বলতে পারে না।

ধর্মও কমিউনিটি জীবনের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে। পূর্ব লন্ডন, বার্মিংহাম, ওল্ডহ্যাম ও লুটনসহ ব্রিটেনের মসজিদগুলো শুধু ইবাদতের জায়গা নয়; এগুলো সামাজিক প্রতিষ্ঠানও। কোরআন শিক্ষা, পরামর্শ, বিয়ের সম্পর্ক, জানাজার সহায়তা ও কমিউনিটি নেতৃত্ব–সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মসজিদ। ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও ব্রিক লেন জামে মসজিদ ব্রিটিশ মুসলিম ও ব্রিটিশ বাংলাদেশি জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

একই সঙ্গে পরিচয় হয়ে উঠেছে বহুস্তরীয়। একজন তরুণ একসঙ্গে ব্রিটিশ, বাংলাদেশি, সিলেটি, মুসলিম, লন্ডনী এবং সাংস্কৃতিকভাবে ইউরোপীয় রুচির মানুষ হতে পারেন। সেই পুরোনো প্রশ্ন, “তুমি কোথা থেকে?”–এখন আর এক বাক্যে উত্তর দেওয়ার মতো সহজ নয় তাদের কাছে।

ব্রেক্সিট, ইসলামোফোবিয়া ও নতুন অনিশ্চয়তা
ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বৃহত্তর ব্রিটিশ রাজনীতির প্রভাবেও গঠিত হয়েছে। ব্রেক্সিট অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ককে তীব্র করেছে। বাংলাদেশিরা ব্রেক্সিট রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য না হলেও, অনেকেই অনুভব করেছেন সামাজিক পরিবেশ কিছুটা কঠোর হয়েছে। ইসলামোফোবিয়া, উগ্র ডানপন্থী তৎপরতা, অনলাইন ঘৃণা ও অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য ব্রিটেনের মুসলিম কমিউনিটির মতো ব্রিটিশ বাংলাদেশিদেরও প্রভাবিত করেছে।

রেস্তোরাঁশিল্পও কঠিন সময় পার করছে। অভিবাসন বিধিনিষেধ, খরচ বৃদ্ধি, কর্মীসংকট, কোভিড-১৯ এবং খাবারের অভ্যাসের পরিবর্তন–সব মিলিয়ে বহু কারি হাউস চাপে পড়েছে। যে শিল্প একসময় সিলেটি অভিবাসীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিয়েছিল, তার অনেক প্রতিষ্ঠান এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা তাঁদের বাবাদের মতো দীর্ঘ সময় রেস্তোরাঁয় কাজ করতে আগ্রহী নন। কিছু নামী রেস্তোরাঁও বন্ধ হয়েছে, কেউ বিক্রি করে দিয়েছেন, কেউ কেউ ব্যবসা বদলে ফেলেছেন।

এটি এক ধরনের সন্ধিক্ষণ। পুরোনো মডেল–এক গ্রাম থেকে পুরুষেরা ব্রিটেনে গিয়ে রেস্তোরাঁয় কাজ করবেন এবং দেশে টাকা পাঠাবেন–এমন অবস্থা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। নতুন মডেল বেশি পেশাভিত্তিক, বেশি শহুরে, বেশি শিক্ষিত, কিন্তু একই সঙ্গে বেশি অনিশ্চিত।১৯৭৮ সালে আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ডের পর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন পূর্ব লন্ডনের মানুষ৷ সেখানে স্লোগানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির একাংশ

যে গল্প বয়ে চলেছে নিরন্তর...
সিলেটি অভিবাসনের গল্পকে সাধারণত সাফল্যের গল্প বলা হয়–এবং এটি সত্য। লস্কর ও কম মজুরির শ্রমিকদের হাত ধরে শুরু হওয়া একটি কমিউনিটি আজ এমপি, চিকিৎসক, ব্যারিস্টার, সলিসিটর, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, শিল্পী, কাউন্সিলর, সাংবাদিক ও সরকারি কর্মী তৈরি করেছে। তারা ব্রিটিশ খাবারের সংস্কৃতি, স্থানীয় রাজনীতি ও নগরজীবন বদলে দিয়েছে।

তবে এটি ত্যাগের গল্পও। প্রথম প্রজন্ম সহ্য করেছে নিঃসঙ্গতা, বর্ণবাদ ও শ্রমশোষণ। দ্বিতীয় প্রজন্ম লড়েছে শিক্ষা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য। তৃতীয় প্রজন্মের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন–কীভাবে সিলেটি ভাষা রক্ষা করা যায়, কীভাবে ব্রিটিশ মুসলিম পরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করা যায়, কীভাবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়, কীভাবে বাংলাদেশ-সংযোগ ধরে রাখা যায় কিন্তু শুধু স্মৃতির বন্দী হয়ে না থাকা যায়।
প্রত্যেক অভিবাসী কমিউনিটির একটি মানচিত্র থাকে। ব্রিটিশ সিলেটিদের মানচিত্রে দুটি নদী–সুরমা, যেখানে স্মৃতি শুরু; আর টেমস, যেখানে ইতিহাস এগিয়ে চলে। এই দুই নদীর মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয় সংগ্রাম, ত্যাগ ও অসাধারণ নবযাত্রার গল্প।

সুরমা থেকে টেমসের পথ কখনও সরল ছিল না। এই পথ গেছে জাহাজ, ডক, কারখানা, কারি হাউস, কাউন্সিল এস্টেট, শ্রেণিকক্ষ, মসজিদ ও পার্লামেন্টের ভেতর দিয়ে। এটি সেই মানুষদের গল্প, যারা শ্রমিক হিসেবে এসেছিলেন, কিন্তু নাগরিক হয়ে দাঁড়িয়েছেন; যারা উপার্জনের জন্য এসেছিলেন, কিন্তু গড়ে তুলেছেন ভবিষ্যৎ; যারা কথায় বহন করেছেন সিলেট, আর সন্তানদের জীবনে বহন করেছেন ব্রিটেনের আগামীর সময়।

ব্রিটিশ বাংলাদেশি লুৎফর রহমান সাদিক বলেছেন, “আমাদের দাদা-নানারা ব্রিটেনে এসেছিলেন কাজের খোঁজে। আমাদের বাবা-মায়েরা গড়ে তুলেছেন একটি কমিউনিটি। এখন আমাদের সন্তানদের ঠিক করতে হবে, তারা কেমন ব্রিটিশ বাংলাদেশি ভবিষ্যৎ চায়।”

সেই ভবিষ্যৎ আর শুধু ব্রিক লেনে আটকে নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, আইনজীবী চেম্বার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কাউন্সিল চেম্বার, গণমাধ্যম স্টুডিও, ছোট ব্যবসা ও ব্রিটেনজুড়ে অসংখ্য ঘরে। তবু আবেগের মানচিত্র এখনও শুরু হয় সিলেটে। সুরমা ও কুশিয়ারা টেমস থেকে হাজার মাইল দূরে, কিন্তু ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জীবনে এই নদীগুলো এখনো একসঙ্গে বয়ে চলে।
সুরমা থেকে টেমস–এই সিলেটি গল্পটি তাই কেবল অভিবাসনের গল্প নয়; এটি এমন মানুষদের গল্প, যারা দূরত্বকে নিয়তিতে পরিণত করেছিলেন। তাঁরা সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন শ্রমিক হিসেবে, দাঁড়িয়েছেন নাগরিক হয়ে, আর বড় করেছেন এমন সন্তানদের, যারা এক হৃদয়ে বহন করে দুই স্বদেশ। ব্রিটেন তাঁদের দিয়েছে সংগ্রাম; তাঁরা ব্রিটেনকে দিয়েছেন শ্রম, স্বাদ, বিশ্বাস, উদ্যোগ এবং অন্তর্ভুক্তির নতুন অধ্যায়।

ব্রিটেনে সিলেটিদের ইতিহাস তাই অভিবাসন ইতিহাসের কোনো প্রান্তিক টীকা নয়। এটি বাংলাদেশের আধুনিক সময়ের অন্যতম বড় গল্প–কীভাবে নদী ও গ্রামের এক অঞ্চল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অভিবাসী কমিউনিটিতে পরিণত হলো, আর কীভাবে সেই ‘জাহাজি’দের সন্তানরাই বদলে দিল ব্রিটেনের চেহারা।

লন্ডনসিলেটসুরমা নদীটেমস নদীব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটি
    শেয়ার করুন:
    advertisement
    advertisement
    ২৪ জুন ২০২৬
    সকাল ৮:০০ টা
    কলম্বিয়া
    ০
    কঙ্গো
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    রাত ১:০০ টা
    সুইজারল্যান্ড
    ০
    কানাডা
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    রাত ১:০০ টা
    বসনিয়া-হার্জেগোভিনা
    ০
    কাতার
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    রাত ৪:০০ টা
    ব্রাজিল
    ০
    স্কটল্যান্ড
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    রাত ৪:০০ টা
    মরক্কো
    ০
    হাইতি
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    সকাল ৭:০০ টা
    চেক প্রজাতন্ত্র
    ০
    মেক্সিকো
    ০
    ২৫ জুন ২০২৬
    সকাল ৭:০০ টা
    দক্ষিণ আফ্রিকা
    ০
    দক্ষিণ কোরিয়া
    ০
    ভেঙে পড়ার ছয় বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, বিচ্ছিন্ন ২০ গ্রাম

    ভেঙে পড়ার ছয় বছরেও সংস্কার হয়নি সেতু, বিচ্ছিন্ন ২০ গ্রাম

    ২৪ জুন ২০২৬, ০০:১২

    ‘জেলিফিশ’ আকৃতিতে উড়ছিল ইরানি ড্রোন

    ‘জেলিফিশ’ আকৃতিতে উড়ছিল ইরানি ড্রোন

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:৫৪

    টিউবওয়েলের পানি খেয়ে হাসপাতালে ৩৩ শিক্ষার্থী

    টিউবওয়েলের পানি খেয়ে হাসপাতালে ৩৩ শিক্ষার্থী

    ২৪ জুন ২০২৬, ০০:৪১

    পাকুন্দিয়ায় বজ্রাঘাতে হাসপাতালে তিনজন

    পাকুন্দিয়ায় বজ্রাঘাতে হাসপাতালে তিনজন

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:৪৮

    নোয়াখালীতে পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই যুবকের

    নোয়াখালীতে পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই যুবকের

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:৩৯

    ক্রোয়েশিয়ার জয়ে পানামার বিদায়

    ক্রোয়েশিয়ার জয়ে পানামার বিদায়

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:০৪

    চল্লিশে পা অসীমে চোখ

    চল্লিশে পা অসীমে চোখ

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:৩২

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিমেন্টবোঝাই ট্রাক খাদে, শ্রমিক নিহত

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিমেন্টবোঝাই ট্রাক খাদে, শ্রমিক নিহত

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:২৭

    আজকের নামাজের সময়সূচি (২৪ জুন)

    আজকের নামাজের সময়সূচি (২৪ জুন)

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:১২

    বোধ হয়

    বোধ হয়

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:২৬

    দুপুরের মধ্যে ১৬ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

    দুপুরের মধ্যে ১৬ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:৪৯

    সড়কে নিম্নমানের কাজ, প্রতিবাদের মুখে পালাল ঠিকাদারের লোকজন

    সড়কে নিম্নমানের কাজ, প্রতিবাদের মুখে পালাল ঠিকাদারের লোকজন

    ২৪ জুন ২০২৬, ০১:২৬

    তবে

    তবে

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:২৫

    বিদ্যুৎ ধনীদের গরিবের অন্ধকার

    বিদ্যুৎ ধনীদের গরিবের অন্ধকার

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৬

    ১ টাকার শিক্ষক লুৎফর রহমান

    ১ টাকার শিক্ষক লুৎফর রহমান

    ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:৩৬

    advertiseadvertise