বাণিজ্য ছাড়িয়ে নজর রাজনীতিতে
আমেরিকার ‘পেছনের উঠোনে’ চীনের পা আরও গভীরে

লাতিন আমেরিকায় চীনের উপস্থিতি এখন বাণিজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের রূপ নিচ্ছে।
এক সময় সম্পর্কের সমীকরণটি ছিল অনেকটাই সরল, লাতিন আমেরিকা থেকে সয়াবিন, তামা, লিথিয়াম কিংবা তেল যাবে চীনে; পাল্টা আসবে চীনা পণ্য, ঋণ আর সেতু-বন্দর তৈরির অর্থ। দুই দশক পরে সেই ছবিটা আর এত সরল নয়। বন্দর থেকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পঞ্চম প্রজন্মের টেলিযোগাযোগ থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে পুলিশ প্রশিক্ষণ–লাতিন আমেরিকায় চীনের উপস্থিতি এখন বাণিজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ক্রমশ রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের রূপ নিচ্ছে। আর নিজেদের দীর্ঘদিনের প্রভাববলয় বলে বিবেচিত এই অঞ্চলে বেইজিংয়ের এমন বিস্তার স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তি বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটনের।
এই পরিবর্তনের ভিত অবশ্য তৈরি হয়েছিল ২০০০-এর দশকের পণ্যবাজারের উত্থানের সময়। চীনের দ্রুত শিল্পায়নে বিপুল কাঁচামালের প্রয়োজন তৈরি হলে লাতিন আমেরিকা হয়ে ওঠে তার অন্যতম প্রধান জোগানদাতা। এখনও অঞ্চলটি থেকে চীন তার সয়াবিন আমদানির সিংহভাগ এবং লিথিয়াম কার্বোনেটের প্রায় পুরোটাই সংগ্রহ করে। খনিজ, জ্বালানি ও খাদ্যের নিরাপদ জোগান তাই বেইজিংয়ের কাছে আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে টেলিযোগাযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ।
অর্থের ধরনও বদলেছে। এক সময় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়ন ব্যাংকগুলো বিপুল অঙ্কের সরকারি ঋণ দিত লাতিন আমেরিকায়। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সেই ঋণ বছরে গড়ে মাত্র ১৩০ কোটি ডলারের কিছু বেশি, আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় অনেক কম। তার বদলে বাড়ছে চীনা বেসরকারি ও রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের সরাসরি বিনিয়োগ। ২০২২ সালে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৫৮ শতাংশই গিয়েছিল তথাকথিত ‘নতুন অবকাঠামো’ খাতে।
বাণিজ্যের আকার অবশ্য কমেনি, বরং নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। ২০২৪ সালে চীন ও লাতিন আমেরিকা-ক্যারিবীয় অঞ্চলের বাণিজ্য পৌঁছেছিল প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলারে, যা এক দশক আগের প্রায় দ্বিগুণ। চীনা সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে রেকর্ড ৫৪৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ২০০০ সালে অঞ্চলটির মোট বৈদেশিক বাণিজ্যে চীনের অংশ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ; ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে। ২০১৯ সাল থেকেই গোটা অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে মূলত এখানেই, এত গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক কি এখন রাজনৈতিক প্রভাবেও রূপ নিচ্ছে?
এর সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি দেখা যাচ্ছে চীন-সেলাক ফোরামে। ৩৩টি লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশ নিয়ে গঠিত সেলাকের সদস্য নয় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। ২০১৪ সাল থেকে এই জোটের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ফোরাম চালাচ্ছে বেইজিং। ২০২৫-২৭ সালের চিন-সেলাক কর্মপরিকল্পনায় বাণিজ্য বা বিনিয়োগের আগেই গুরুত্ব পেয়েছে রাজনৈতিক সম্পর্ক–উচ্চপর্যায়ের আলোচনা, আন্তর্জাতিক বিষয়ে সমন্বয় এবং সংসদ, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বেইজিং আরও ঘোষণা করেছে, প্রতি বছর সেলাকভুক্ত দেশগুলোর রাজনৈতিক দল থেকে ৩০০ প্রতিনিধিকে চীনে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সঙ্গে রয়েছে সাংবাদিক, গবেষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। সাইবার নিরাপত্তা, আন্তর্দেশীয় সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা, পুলিশ প্রশিক্ষণ, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিচালনা–সহযোগিতার পরিধিও এখন এসব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষ্য এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যা কোনও দেশে সরকার বদলালেও সহজে ভেঙে যাবে না।
এই নতুন ভূরাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক পেরুর চানকাই বন্দর। বহু বিলিয়ন ডলারের এই গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ৬০ শতাংশ মালিকানা চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কসকো শিপিং পোর্টসের। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বন্দরটি পেরুকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রবেশদ্বার বানানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সরাসরি চীনে পণ্য পাঠানোর সময় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে; চীন ও ব্রাজিল আবার চানকাইয়ের সঙ্গে ব্রাজিলের আটলান্টিক উপকূল যুক্ত করতে রেলপথ তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
কিন্তু যে বন্দরকে পেরু দেখছে অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে, সেটিই ওয়াশিংটনের চোখে নিরাপত্তার প্রশ্ন। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছিল, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় চীনের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকলে পেরুর সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বেইজিং সেই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানায়, চানকাই পেরুর সার্বভৌমত্ব ও আইনকানুনের অধীনেই রয়েছে। কসকোও একই দাবি করেছে।
শুধু চানকাই নয়। ২০২৫ সালের এক সমীক্ষায় লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততা থাকা ৩৭টি বন্দর প্রকল্প চিহ্নিত করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক সিএসআইএস। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে৷ সব বন্দর চীনের মালিকানাধীন নয়। সৌদিভিত্তিক গণমাধ্যম আল মাজাল্লার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই ৩৭টির মধ্যে মাত্র ১০টিতে চীনা কোম্পানি মালিক বা পরিচালনাকারী; অন্যগুলোতে চীনা অর্থায়ন, নির্মাণকাজ বা সরঞ্জাম রয়েছে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, বন্দরগুলো ভবিষ্যতে সরবরাহ ব্যবস্থা, তথ্য, সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার এমনকি সামরিক লজিস্টিকসের ক্ষেত্রেও কৌশলগত গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে লাতিন আমেরিকা যে চীনের রাজনৈতিক বলয়ে চলে যাচ্ছে, বিষয়টি এত সরল নয়। বরং অঞ্চলটির বহু দেশ বেইজিংয়ের বিনিয়োগকে ব্যবহার করছে নিজেদের বিকল্প বাড়াতে৷ ওয়াশিংটনের উপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য শক্তির সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক রাখছে। ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোট বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, অধিকাংশ গণতান্ত্রিক লাতিন আমেরিকান দেশ অর্থনৈতিক বিষয়ে চীনের কাছাকাছি ভোট দিলেও মানবাধিকার, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগzত অখণ্ডতার প্রশ্নে অনেক সময় পশ্চিমা দেশগুলোর পাশে থেকেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এখনও রাজনৈতিক আনুগত্যের সমার্থক হয়নি।
সেই সমীকরণই সম্ভবত লাতিন আমেরিকার বর্তমান কৌশলের মূল কথা: বেইজিংয়ের অর্থ নেবে, ওয়াশিংটনের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখবে; কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটি নিজেদের হাতে রাখতে চাইবে।
এদিকে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা থামেনি। ১৮ আগস্ট বেইজিংয়ে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়ার সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সহযোগী বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং তাতে বাইরের হস্তক্ষেপ হওয়া উচিত নয়। একই সময়ে ১৮ ও ১৯ আগস্ট চীনের ঝেংঝৌতে লাতিন আমেরিকা-ক্যারিবীয় অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংযোগ নিয়ে নতুন উন্নয়ন ফোরামও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দুই দশক আগে যে সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল সয়াবিন, খনিজ আর ঋণ, এখন তার সঙ্গে জুড়েছে বন্দর, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক দল ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। তাই লাতিন আমেরিকায় চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা আর শুধু কে বেশি পণ্য কিনছে তার হিসাব নয়, কে ভবিষ্যতের অবকাঠামো তৈরি করবে, প্রযুক্তি দেবে এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার উপস্থিতি কতটা থাকবে, লড়াই এখন সেই জায়গায়।






