ব্যাংকক যেভাবে মিয়ানমার জান্তাকে বৈধতা দিচ্ছে

জেনারেল ই উইন উ এবং জেনারেল উকরিস বুনতানোন্দে। ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংককের একটি হোটেলে বৃহস্পতিবার সকালে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কুশল বিনিময় করতে দেখা গেছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের শীর্ষ দুই সেনা কর্মকর্তাকে। তারা হলেন চার মাসের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার জান্তার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেনারেল ই উইন উ এবং থাইল্যান্ডের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল উকরিস বুনতানোন্দে। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নথি অনুযায়ী ই উইন উ উপস্থিত হয়েছিলেন দুই দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত স্থায়ী ফোরাম ‘মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হাই-লেভেল কমিটি’র নবম বৈঠকে। আলোচনার এজেন্ডাও ছিল বেশ পরিচিত। সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক চোরাচালান, অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্ক এবং সামরিক সহযোগিতা। তবে এই বৈঠকের সময়টা কোনোভাবেই সাধারণ ছিল না।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই থাই প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছিলেন জান্তার শীর্ষ নেতা মিন অং হ্লাইংকে। নির্বাচনের পর ইউনিফর্ম ছেড়ে বেসামরিক পোশাকেই এসেছিলেন তিনি।
সহজ ভাষায় থাইল্যান্ড এখন এই নতুন মোড়কে আসা জান্তা সরকারের দুই মূল স্তম্ভকে আলাদাভাবে স্বাগত জানাচ্ছে। মিন অং হ্লাইংকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবং ই উইন উকে সামরিকপ্রধান হিসেবে। এর মাধ্যমে মূলত দুদিক থেকেই তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। নেপিদো যে দাবি করত জান্তার সামরিক ও বেসামরিক শাসন আলাদা, সেটি বৈধতা পাচ্ছে।
মিন অং হ্লাইংয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত অনুগত ই উইন উ ২০২০ সালে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব নেন। অভ্যুত্থানের দিন সকালে তিনিই বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চিকে গ্রেপ্তারকারী দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর ১০ দিন পরই ওয়াশিংটন তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত সাবেক এই গোয়েন্দাপ্রধান ‘প্রথম গোয়েন্দা কর্মকর্তা’ হিসেবে সেনাপ্রধান হয়েছেন। তিনি এখন ক্যামেরার সামনে প্রথাগত আঞ্চলিক সেনাপতির রূপে হাজির হচ্ছেন। আর তাকে চিরায়ত সামরিক নিয়মেই স্বাগত জানাচ্ছে থাইল্যান্ড। সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির চেয়ে জান্তার ভাবমূর্তির এই পরিবর্তন তাদের কাছে বেশি মূল্যবান হতে পারে।
তবে ই উইন উ কেবল ছবি তোলার জন্য ব্যাংকক যাননি। জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রবাহ বন্ধে তিনি থাই সামরিক বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত ৬ আগস্ট মিন অং হ্লাইংও প্রধানমন্ত্রী অনুতিনের কাছে একই অনুরোধ করেছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে থাই প্রধানমন্ত্রী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের নির্দেশ দেন।
নেপিদো তাদের ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের দক্ষিণ অংশ বরাবর সাহায্য চায়। এখানে কারেন, কারেন্নি এবং অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা সক্রিয়। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে চীন এরই মধ্যে তাদের প্রভাবের জানান দিয়েছে। সীমান্ত এলাকার স্ক্যাম সেন্টারগুলো ধ্বংস করার সময় বেইজিং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স পরিচালিত ‘অপারেশন ১০২৭’-এ প্রাথমিক সায় দিয়েছিল। কিন্তু সামরিক বাহিনীর নর্থ-ইস্টার্ন কমান্ডের সদর দপ্তর লাশিওর পতনের পর সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে দেয় বেইজিং। পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে উত্তরের শান রাজ্যের যুদ্ধক্ষেত্র অনেকটাই স্থবির হয়ে যায়।
জান্তার কাছে এটি যেমন ছিল একপ্রকার ত্রাণ, তেমনি একটি সতর্কবার্তাও। সেনাবাহিনী যে সশস্ত্র গোষ্ঠীদের একা সামলাতে পারছিল না, তাদের ওপর চীনের প্রভাব কতটা গভীর বেইজিং তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। যে সামরিক বাহিনী গত কয়েক দশক ধরে নিজেদের সার্বভৌমত্বের কথা বলে আসছে এবং বহিরাগত প্রভাব প্রতিহত করার বড়াই করে আসছে, তাদের জন্য চীনের ওপর এই মাত্রার নির্ভরতা অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী অবশ্য অতীতেও এই ধরনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল (হেজিং) গ্রহণ করেছে। ২০১১ সালে মিন অং হ্লাইং সেনাপ্রধান হওয়ার পর বেইজিং সফরের আগে তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভিয়েতনামকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই সময় বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে চীনের বাইরে নিজেদের কৌশলগত পরিধি বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন।
ই উইন উ এখন সেই জটিল সমস্যারই এক কঠিন সংস্করণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। চীন এখন মিন অং হ্লাইংয়ের রাজনৈতিক কাঠামোকে সমর্থন করছে এবং যেসব জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নেপিদো একা হারাতে পারছে না, তাদের ওপর চীনের শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ঠিক এই জায়গাতেই থাইল্যান্ডের গুরুত্ব। থাই সশস্ত্র বাহিনী একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও তাদের বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া কোবরা গোল্ড মার্কিন-থাই সামরিক জোটের মূল ভিত্তি হলেও, ব্যাংকক নিয়মিতভাবে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গেও মহড়া পরিচালনা করে।
এর নজির আগেও দেখা গেছে। ২০১২ সালে ওয়াশিংটন যখন সতর্কভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করছিল, তখন মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের ‘কোবরা গোল্ড’ মহড়া পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিল থাইল্যান্ড। একে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পুনরায় নেপিদোর সামরিক যোগাযোগ স্থাপন এবং চীনের ওপর মিয়ানমারের নির্ভরতা কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। এমনকি রোহিঙ্গা সংকটের পরও ২০১৮ সালে থাইল্যান্ড ফের মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের এই মহড়ার মানবিক অংশটি পর্যবেক্ষণ করতে আমন্ত্রণ জানায়।
ই উইন উ’র সফরকেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখা উচিত। বেইজিংয়ের বাইরে অন্যান্য বিকল্পের পথ উন্মুক্ত করতে মিয়ানমারের নতুন সেনাপ্রধানের প্রচেষ্টা।
জান্তা চায় থাইল্যান্ড পুনরায় বাণিজ্য জোরদার করুক। পাশাপাশি আসিয়ানে যেন জান্তাকে স্বাভাবিক সরকার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করা হয়। ব্যাংকক এরই মধ্যে আসিয়ানে মিয়ানমারের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সীমান্তে শান্তি ফেরানো, অপরাধ কমানো, বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ এবং শরণার্থী সংকট কমানোর ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের নিজস্ব যৌক্তিক স্বার্থ রয়েছে। তবে প্রতিদানে তারা এ পর্যন্ত তেমন কিছুই পায়নি। মিন অং হ্লাইং ব্যাংকক ত্যাগ করার মাত্র কয়েকদিন পরই আসিয়ানের সামনে আয়োজক থাইল্যান্ডকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দেয় নেপিদো। তারা জানায়, মিয়ানমারবিষয়ক আসিয়ানের বিশেষ দূতের আর কোনো প্রয়োজন নেই এবং অং সান সু চির বিনা শর্তে মুক্তির আহ্বানও প্রত্যাখ্যান করে।
তাই ব্যাংকক যদি প্রতিবেশী দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়, তবে যে শাসন বহু দশক ধরে এ দুটি জিনিস নষ্ট করে আসছে, সেই শাসনকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
দ্য ইরাবতী থেকে অনূদিত








