রেকর্ড ১১৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় পারমাণবিক অস্ত্রে, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: রয়টার্স
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর জলবায়ু সংকট সামাল দিতে অর্থের অভাবে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ, তখন অন্য প্রান্তে মৃত্যুর আরেক নাম পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে বইছে রেকর্ড ব্যয়ের ধারা।
গত বছর বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ তাদের অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে ব্যয় করেছে প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার। যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে বেড়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল ব্যয়ের দৌড়ে সবার ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার একক ব্যয়ই অন্য সব দেশের সম্মিলিত ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে।
এসব তথ্য উঠে এসেছে নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইক্যান) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।
আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ ২০২৫ সালে মোট ১১৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের জন্য। আগের বছরের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি একাই পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করেছে প্রায় ৬৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। যা আগের বছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বেশি। এই ব্যয় বিশ্বের অন্য সব পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
ব্যয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। পারমাণবিক অস্ত্রের পেছনে আনুমানিক ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে দেশটি। এর পর রয়েছে যুক্তরাজ্য ১২ দশমিক ৬ বিলিয়ন, রাশিয়া ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন এবং ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে ফ্রান্স
অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়ার ব্যয় ছিল ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করেছে উত্তর কোরিয়া এবং সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ভারত।
আইক্যানের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সম্মিলিতভাবে ৪৭১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো। একই সঙ্গে আগামী কয়েক দশক ধরে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ধরে রাখার পরিকল্পনা করছে এসব দেশ।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে আইক্যান উল্লেখ করেছে, এমন সময়ে এই বিপুল ব্যয় করা হচ্ছে যখন অনেক দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রকল্পসহ বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক জনকল্যাণমূলক খাতে।
সংস্থাটির ভাষ্য, জলবায়ু অভিযোজন চুক্তি থেকে সরে আসা কিংবা বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধ প্রতিরোধে ন্যায্য অবদান না রেখে পারমাণবিক অস্ত্রে বিপুল অর্থ ব্যয় করার অর্থ হলো মানবজাতিকে রক্ষার পরিবর্তে ধ্বংসের উপকরণ তৈরি, উন্নয়ন ও অর্থায়নে আগ্রহ দেখানো।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের এক দিন আগে সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) সতর্ক করে জানিয়েছিল, নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করার দিকে ঝুঁকছে পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো।
বর্তমানে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের কাছে সম্মিলিতভাবে ১২ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
২০১৭ সালে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করার প্রথম বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক চুক্তি গ্রহণ করে জাতিসংঘ। এখন পর্যন্ত ৯৯টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর, অনুমোদন বা যোগ দিয়েছে। চুক্তিটি কোনো দেশকে পারমাণবিক অস্ত্রসহ গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি, পরীক্ষা বা অধিগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে।
তবে এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে যোগ দেয়নি কোনো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ।
১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের আকার সীমিত করতে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। কিন্তু এ ধরনের সর্বশেষ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। এর পরিবর্তে এখনো কার্যকর হয়নি কোনো নতুন চুক্তি।
সূত্র: আলজাজিরা






