বাস্তুচ্যুতি যেন তার কপাল লিখন

১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের একজন জীবিত সাক্ষী আবদেল মাহদি আল-উহাইদি
ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজের ঘরের এক কোণে বসে আছেন ৮৫ বছরের বৃদ্ধ আবদেল মাহদি আল-উহাইদি। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের এই ভাঙা বাড়িতেই তিনি এখন জ্বালিয়েছেন এক চিলতে আগুন। সেই আগুনের তাপে বানাচ্ছেন কফি আর উদাস চোখে দেখছেন নিজের সাজানো সংসারের ধ্বংসস্তূপ। জীবনের লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আজ তার চারপাশ জুড়ে কেবলই হাহাকার।
তার পাশেই চুপটি করে বসে আছেন স্ত্রী আজিজা। দীর্ঘ ৬০ বছরের সংসার তাদের। মানুষ কত স্বপ্ন দেখে সন্তান নিয়ে, কিন্তু তাদের কপালে জোটেনি কোনো সন্তান। তবে ভালোবাসা কমেনি এতটুকু। মাহদি পরম মমতায় আগলে রেখেছেন তার মৃত ভাইয়ের পাঁচ ছেলেকে। ছোটবেলায় এতিম হওয়া সেই ছেলেদের তিনি মানুষ করেছেন নিজের সন্তানের মতো, দিয়েছেন বিয়েশাদিও।
১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ বড় ক্লান্ত। ১৯৪৮ সালের সেই ভয়ংকর ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের সময় তিনি ছিলেন ছোট্ট এক শিশু। তখন ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের নামে সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে খেদিয়ে দেওয়া হয়েছিল নিজ ভূমি থেকে। মাহদি বলছেন, সেই দিনের সেই কষ্ট আর আজকের এই ইসরায়েলি যুদ্ধের তাণ্ডব যেন এক সুতোয় গাঁথা, তবে এবারের নৃশংসতা ছাড়িয়ে গেছে আগের সবকিছুকে।
ভাগ ‘হয়ে যাচ্ছে’ আফ্রিকা
১৬ মে ২০২৬
তার কণ্ঠে ঝরে পড়ছে আক্ষেপ, ‘আমরা ছিলাম বির আল-সাবার মানুষ। ওইটাই ছিল আমাদের আসল ঠিকানা।’ মরুভূমির সেই বড় শহরটা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল দখল করে নিলে ভিটেমাটি হারান মাহদিরা। সেই থেকেই শুরু তাদের যাযাবর জীবন।
পুরনো সেই দিনের কথা
মাহদির স্মৃতি আজও বড্ড পরিষ্কার। সেই ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সাথে নিজেদের জমিতে গবাদি পশু নিয়ে কাটানো দিনগুলোর কথা তিনি ভুলতে পারেন না। তখনকার সাধারণ আর নিশ্চিন্ত জীবনটা যেন চোখের সামনে ভাসে তার।
তিনি মনে করতে পারেন সেই উত্তপ্ত দিনের কথা, যখন বির আল-সাবাতে খবর এল জায়নবাদী হাগানাহ বাহিনী ধেয়ে আসছে। পাড়ার মুরুব্বিদের কেউ চাইছিলেন লড়াই করতে, কেউ বা জান বাঁচাতে পালাতে। শেষমেশ তারা ঠিক করলেন গাজার দিকে পা বাড়াবেন। ভেবেছিলেন মাসখানেক পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে ঠিকই ফিরে আসবেন আপন কুটিরে।
সেই আশায় বাবা-মা আর ভাইবোনদের নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন মাহদি। সাথে নিলেন কিছু গরু-ছাগল আর সামান্য সম্বল। দিনকে দিন তারা কেবল হেঁটেই গেছেন, ক্লান্তি লাগলে বিশ্রাম নিয়েছেন আবার চলা শুরু করেছেন। মাহদি জানান, ‘আমরা তো ভেবেছিলাম এটা সাময়িক, কপালে যে চিরস্থায়ী নির্বাসন লেখা আছে তা কে জানত!’
প্রথমে গাজার জাইতুন আর পরে জাবালিয়া ক্যাম্পে যখন তারা ঠাঁই নিলেন, শুরু হলো এক নরকবাস। তাঁবুর জীবন যে কত কষ্টের! বৃষ্টিতে ভিজে একাকার, হাড়কাঁপানো শীত আর গরমে নাভিশ্বাস। তার ওপর ছিল পেটের খিদে, কলেরার ভয় আর নোংরা পরিবেশের সেই দুঃসহ সব স্মৃতি।
ফেরার আকুতি আজও বাজে মনে
মাহদি তার বাবা আর দাদার মুখে শুনেছেন এক অমর বাণী ‘একদিন আমরা ফিরবই।’ তারা ছোটদের কানে সব সময় এই কথা গেঁথে দিতেন যাতে কেউ কোনোদিন ফেরার অধিকার ভুলে না যায়। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হলো না। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে বারবার যুদ্ধ এসেছে, আর বারবার তারা শূন্য থেকে শুরু করেছেন।
একসময় ইসরায়েলের ভেতর নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছেন মাহদি। কয়েক ভাই মিলে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন সুন্দর ঘরবাড়ি, কিনেছিলেন জমি। তারা ভেবেছিলেন জীবনের শেষ সময়টা বুঝি একটু শান্তিতে কাটবে। কিন্তু বিধি বাম! বর্তমান যুদ্ধ তাদের তাসের ঘরের মতো সব স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
হতাশ গলায় মাহদি বলছেন, ‘ঘর বাঁধলাম, গাছ লাগালাম, ভাবলাম জীবনটা বুঝি এবার থিতু হলো। অথচ আজ সব শেষ। একটা গাছও আস্ত রাখেনি ওরা।’ গাজার জীবন আগে থেকেই ছিল অবরুদ্ধ, কিন্তু এবারের মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ তিনি বাপদাদার জন্মেও শোনেননি।
গাজার বর্তমান বিভীষিকা
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মাহদির বার্ধক্যকে করেছে বিষাদময়। এই বয়সে যখন লাঠি হাতে একটু হাঁটতে কষ্ট হয়, তখন তাকে বারবার পালাতে হয়েছে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। কখনো গাজা বন্দর, কখনো দেইর আল-বালাহ কিন্তু শান্তি জোটেনি কোথাও।
জাবালিয়ার এক স্কুলে যখন তারা আশ্রয় নিলেন, ইসরায়েলি ট্যাংক আর সেনারা সেখানেও হানা দিল। সেই হাহাকার আর কান্নার শব্দ আজও কানে বাজে তার। লাউডস্পিকারে নির্দেশ এল দক্ষিণ দিকে যাওয়ার। মাহদি আর তার বৃদ্ধা স্ত্রী একে অপরের ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন সেই অনিশ্চিত পথে।
মাহদি বলেছেন, ‘আমি তো চেয়েছিলাম নিজের ঘরেই মরে পড়ে থাকতে। পূর্বপুরুষদের মতো ঘর ছাড়ার ভুলটা করতে চাইনি। কিন্তু মরণ যখন চোখের সামনে, তখন আর কি করা!’ সেই যাযাবর জীবনে বালুর ওপর তাঁবু খাটিয়ে অভুক্ত থাকা দিনগুলোর কথা মনে করে আজও তার চোখ ভিজে ওঠে। তিনি স্বীকার করেন, সম্মানের সাথে মরতে পারাটাও এখন গাজাবাসীর জন্য বিলাসিতা।
মাটির টানেই পড়ে থাকা
২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন যুদ্ধবিরতির একটা খবর এল, মাহদি ফিরে এলেন তার সেই তছনছ হয়ে যাওয়া জাবালিয়াতে। নিজের এলাকাকে যখন তিনি ধ্বংসস্তূপের পাহাড় হিসেবে দেখলেন, বুকটা ফেটে যাচ্ছিল তার। লাঠি হাতে এখন তিনি ওই ভাঙা ইটের ওপর দিয়েই হাঁটাচলা করেন, দু-একবার আছাড়ও খেয়েছেন।
মাহদি দেখেছেন ১৯৫৬ এর যুদ্ধ, ৬৭ এর লড়াই আর বহু গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু এবারের মতো এমন দখলদারি তিনি আগে দেখেননি। আরব দেশগুলোর নীরবতা আর বিশ্ববাসীর উদাসীনতা তাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। তিনি মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের আজ পুরো দুনিয়া একা ছেড়ে দিয়েছে।
নানা প্রতিশ্রুতি আর সুন্দর ভবিষ্যতের কথা এখন আর তাকে টানে না। তার কাছে এই সবকিছুই এখন প্রতারণা মনে হয়। তবে শত কষ্টের মাঝেও একটি জায়গায় মাহদি অটল তা হলো নিজের জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা।
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমারে যদি কেউ এই ভাঙা বাড়ির বদলে নিউ ইয়র্কের রাজপ্রাসাদও দেয়, আমি যাব না। যারা ঘর ছেড়েছিল, তারা আর কোনোদিন ফিরতে পারেনি। আমি এই পোড়া মাটিতেই মরতে চাই, আর এই মাটিতেই যেন হয় আমার কবর।’
সূত্রঃ আল-জাজিরা











