আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে গেল কেপ ভার্দে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আর্জেন্টিনা সেভাবে উল্লাসে মাতেনি। তারা শুধু পরের রাউন্ডের টিকিট পেয়ে খুশি। এ ম্যাচের গল্পটা কেপ ভার্দের। আমি জানি তারা হেরেছে, কিন্তু পুরো পৃথিবীর হৃদয় জিতেছে কেপ ভার্দে’— আর্জেন্টিনা- কেপ ভার্দে ম্যাচ শেষে ‘ফক্স স্পোর্টসে’ বলছিলেন বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি তারকা থিয়েরি অঁরি।
শুধু অঁরি নন, পুরো ফুটবল বিশ্বেরই হৃদয় কেড়েছে কেপ ভার্দে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে সমালোচনা শুনেছিল ফিফা। শঙ্কা ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানির সঙ্গে ছোট দলের ম্যাচগুলো একতরফা হওয়ার। র্যাংকিংয়ে ৬৪ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে সরিয়ে দিয়েছে সেই শঙ্কার মেঘ। স্পেন, উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে ড্রয়ের পর নকআউটে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দুবার পিছিয়ে পড়েও সমতা ফেরায় তারা। তবে শেষবেলায় অতিরিক্ত সময়ে আত্মঘাতী গোলে কেপ ভার্দের রূপকথা থামায় আর্জেন্টিনা। এর নায়ক সেই লিওনেল মেসি। নিজে করেছেন এক গোল। অতিরিক্ত সময়ে তার কর্নার থেকেই আত্মঘাতী গোলে নিশ্চিত হয় শেষ ষোলোর টিকিট। হাঁফ ছেড়ে বাঁচা মেসি ম্যাচ শেষে দেখা করেন কেপ ভার্দে খেলোয়াড়দের সঙ্গে। এরপর হাসতে হাসতে বলেছেন, ‘ওরা এখন আমার জার্সি, স্মারক— সব চাইছে; অথচ মাঠের ভেতর লাথি মেরে মেরে শেষ করে দিচ্ছিল!’
আর্জেন্টিনা ভুগেছে, তবে জিতেছে। ব্যবধানটা খুব কম ছিল, কিন্তু তারা জিতেছে। লিওনেল স্কালোনির দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই একটা গুণ আলাদা করেছে আর্জেন্টিনাকে, সেটা ম্যাচ বুঝতে পারা। তারা বুঝতে পেরেছিল যে সুবিধাগুলো কোথায় আছে। হাইড্রেশন ব্রেকের পর আর্জেন্টিনা পাসের গতি বাড়ায় আর প্রথম গোলটি পেয়ে যায়। এরপর থেকে ওয়ান-টাচ পাস, ক্রমাগত মুভমেন্ট এবং ড্রিবলিংয়ে তারা ডিফেন্ডারদের টেনে বের করতে শুরু করে। যতক্ষণ না কোনো ডিফেন্ডার তার জায়গা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছিলেন, ততক্ষণ কেউ বল হাতছাড়া করছিল না। কেবল তখনই ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছিল আর কেপ ভার্দের রক্ষণাত্মক কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। তবে দুবার পিছিয়ে পড়েও চোখধাঁধানো দুই গোলে কেপ ভার্দের ম্যাচে ফেরাটা বিশেষ কিছু। শেষদিকে এমিলিয়ানো মার্তিনেস অবিশ্বাস্য একটা সেভ না করলে অন্যরকমও হতে পারত ম্যাচের ছবিটা।
ম্যাচ শেষে তাই কোচ লিওনেল স্কালোনির স্বস্তি, ‘হেরে গেলে আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যেতাম! তবে এটাই ফুটবল। আমাকে অনেকেই বলেছিল, আমরা নাকি সহজ প্রতিপক্ষ পেয়েছি। এখন নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পারছেন, বিশ্বকাপে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই। ১২০ মিনিট খেলে ছেলেরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তবে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ফুসফুসে যখন বাতাসের ঘাটতি তৈরি হয়, তখন তারা হৃদয় দিয়ে খেলে।’
শেষ পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে পেরে না উঠলেও কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস গর্বিত তার দেশের মানচিত্র সারা বিশ্বে তুলে ধরতে পেরে, ‘এই বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় জিনিসটা হলো, মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায়, তা আর কেউ জিজ্ঞেস করে না। এটা আমাদের জন্য একটা ইতিহাস।’ দেশটির ফুটবল কোচ বুবিস্তাও গর্বিত তার শিষ্যদের নিয়ে, ‘আমরা দেখিয়েছি, ছোট দেশ হলেও পৃথিবীর সেরা দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করতে পারি। এটা গর্বের। আমরা দেশের জন্য ইতিহাস তৈরি করেছি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আমরা যেভাবে খেলেছি আর দুবার সমতায় ফিরেছি, তা অবিশ্বাস্য।’
আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাদের ম্যাচটা ছিল ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াই। তবে ফুটবল মাঠটা যে সবার জন্য সমান, সেটিই বোঝাল কেপ ভার্দে। লিওনেল মেসি মানেই অতিমানবীয় কিছু। আর ভোজিনহার মতো অখ্যাত গোলকিপার একের পর এক সেভ করে দেখালেন, মেসিও রক্ত-মাংসেরই মানুষ।
তাদের অদম্য মানসিকতা নিয়ে স্কটিশ সাবেক ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন বলেছেন যেন সবার মনের কথাটাই, ‘কেপ ভার্দে হেরেছে ঠিকই, কিন্তু আসলে তারাই জিতেছে। বিশ্বকাপের আসল গল্পটাই হলো কেপ ভার্দে। একটি ফুটবল দলের মধ্যে আপনি ঠিক এটাই দেখতে চান। তাদের রূপকথার রেশ থেকে যাবে।’
ইংলিশ সাবেক তারকা গ্যারি নেভিলও ভাসালেন প্রশংসায়, ‘তারা কাঁদছে, কারণ তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এটি এমন একমুহূর্ত, যা এই খেলোয়াড়দের অনেকের জীবনে হয়তো আর ফিরে আসবে না। এটি একই সঙ্গে জাদুকরী ও বেদনারও।’
এ বেদনা নিয়েই দেশে ফিরছে কেপ ভার্দে আর আর্জেন্টিনা শেষ ষোলোতে অপেক্ষায় আফ্রিকার আরেক দেশ মিসরের। লিওনেল মেসি-মোহাম্মদ সালাহর সেই লড়াইয়ের অপেক্ষা এখন।




