শেষদিকের গোলেই রোমাঞ্চকর এই বিশ্বকাপ
- শেষদিকে গোলের পরিসংখ্যান:
- কাতার ২০২২: ২৪%
- রাশিয়া ২০১৮: ২৩%
- ব্রাজিল ২০১৪: ২৩.৯%
- উত্তর আমেরিকা ২০২৬: ২৯.২%

জাপানের বিপক্ষে মর্তিনেল্লির শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিল পৌঁছে যায় শেষ ষোলোতে
ম্যাচের শেষ কয়েক মিনিট। এটা এখন আর অপেক্ষার সময়ের মধ্যে আটকে নেই বরং ২০২৬ বিশ্বকাপ এটাকে বানিয়ে ফেলেছে ম্যাচের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়। নকআউটের প্রথম রাতটাই কী নাটকীয় রূপ নিয়েছে দেখুন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯২ মিনিটের গোলে কানাডার উল্লাস, জাপান ম্যাচে ৯৫ মিনিটে মার্তিনেল্লির গোলে ব্রাজিলের শেষ ষোলোতে যাওয়ার স্বস্তি আর ১০২ মিনিটে জোনাথন টাহ’র গোল বাতিলের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে জার্মানির। তিনটা গোলের সময় বলছে, ৯০ মিনিটের পরেই ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ!
এই বিশ্বকাপে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে যেন সময়ই বেশি কথা বলছে। শেষ মুহূর্তের গোলই হয়ে উঠছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চরিত্র। এই গোলেই লিখে দিচ্ছে ম্যাচের ভাগ্য, বদলে দিচ্ছে বিশ্বকাপের গল্প।
সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ম্যাচ যখন শেষ সময়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনও গোলশূন্য ড্র ছিল। বদলি খেলোয়াড় হয়ে জোহান মানজাম্বি মাঠে নেমে তিন মিনিটের মধ্যেই গোল করেন এবং বদলে যায় খেলার চেহারা। শেষ ১৫ মিনিট ও স্টপেজ টাইমে আরো তিন গোল করে বসনিয়াকে হারায় ৪-১ গোলে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে বসনিয়া ৭০তম মিনিটের পর চার বা তারও বেশি গোল হজম করে।
এটি শেষ সময়ে গোলের প্রবণতার একটি বড় উদাহরণ। পরিসংখ্যান বলছে, এই আসরের প্রথম রাউন্ডে শেষ ১৫ মিনিট ও স্টপেজ টাইমে হয়েছে বেশি গোল। সেটা মোট গোলের ২৯.২ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল হয়েছে প্রথমার্ধের শেষভাগে অর্থাৎ ৩১ তম মিনিট থেকে বিরতি পর্যন্ত। এটি কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গোল বাড়াচ্ছে হাইড্রেশন ব্রেক!
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর গরম আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করে ফিফা দুটো হাইড্রেশন ব্রেক বাধ্যতামূলক করেছে দুই অর্ধে। কাকতালীয়ভাবে টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোল হয়েছে এই ব্রেকগুলোর পরবর্তী সময়ে। এই নিয়মের সমালোচনা হলেও হাইড্রেশন ব্রেকের সঙ্গে গোলের সরাসির সম্পর্কের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে এই বিরতি খেলোয়াড়দের গরমের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি গোলের সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা সেটা একটি প্রশ্ন।
তাপমাত্রা যেমনই হোক, এই বিরতিতে কোচরা দলকে নতুনভাবে সাজানোর, কৌশল বদলের সুযোগ পান। এই কৌশলগত পুনর্বিন্যাসই হয়তো বিরতির পর গোল বাড়ার একটি কারণ।
শেষদিকে গোল আগের চেয়ে বেশি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে শেষ দিকে গোল হওয়া নতুন ব্যপার নয়। ৭৬ মিনিট থেকে ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই সময়ে গোল বরাবরই বেশি হয়েছে অন্য সময়ের তুলনায়। মোট গোলের এক-চতুর্থাংশ এই সময়ে হয়।
তবে উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে গোলের সংখ্যাটা বেশ চোখে পড়ার মতো। অন্যান্য বিশ্বকাপের সঙ্গে শেষদিকের গোলের তুলনাটা এমন –
কাতার ২০২২: ২৪%
রাশিয়া ২০১৮: ২৩%
ব্রাজিল ২০১৪: ২৩.৯%
উত্তর আমেরিকা ২০২৬: ২৯.২%
এই বিশ্বকাপ এখনো শেষ হয়নি। তবে প্রথম রাউন্ডের হিসাবে শেষদিকে গোলের হার দাঁড়িয়েছে ২৯.২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর মধ্যে ২০০৬ সালে জার্মানির আসরে শেষ দিকে গোলের হার ছিল সবচেয়ে বেশি, মোট গোলের ৩০.৬ শতাংশ।
ক্লান্তি তৈরি করছে সুযোগ
এটাই সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা। শারীরিক ক্লান্তির কারণে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের মনসংযোগ কমে যায়, ছোট ছোট ভুল বেড়ে যায়। একটি ভুল ট্যাকল বা ডিফেন্ডারের মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্তে বদলে যায় ম্যাচের ভাগ্য।
আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের শারীরিক চাপ নিতে হয় বেশি। টুর্নামেন্টে অল্প বিশ্রামে একের পর এক ম্যাচ খেলতে হয়। ফলে শেষ ১৫ মিনিটে রক্ষণভাগে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয় আর এটাই আক্রমভাগের দক্ষ ফুটবলারদের তৈরি করে দেয় গোলের সুযোগ।
ম্যাচে শেষদিকের গোলে বদলি ফুটবলারের প্রভাবও খুব বড় হয়ে ওঠছে। একটি দল পাঁচজন খেলোয়াড় বদলাতে পারে। তাই শেষদিকে কোচরা দ্রুতগতির ও আক্রমণভাগে সতেজ খেলোয়াড় নামান। ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে এই নতুন খেলোয়াড়রা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি সুবিধা পান।
স্টপেজ টাইম এখন অনেক দীর্ঘ
আগে সাধারণত প্রতিটি অর্ধে এক বা দুই মিনিট যোগ করা হতো অতিরিক্ত সময় বা স্টপেজে টাইম হিসাবে। এখন ফিফার নির্দেশনা হচ্ছে, বদলি, ইনজুরি, গোল উদযাপন ও সময় নষ্ট- সবকিছু হিসাব করে ঠিক করতে হবে অতিরিক্ত সময়। ফলে শেষ ১৫ মিনিট বাস্তবে আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ।
যেমন জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলের মার্তিনেল্লি গোল করেন ৯৫ মিনিটে। উদযাপনের কারণে ৬ মিনিটের অতিরিক্ত সময় প্রায় ১০ মিনিটে গিয়ে ঠেকেছিল।
সুতরাং শেষ বাঁশির আগে ঘুমোতে গেলে আপনি মিস করতে পারেন ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ। শেষ মুহূর্তের গোলই হয়ে গেছে এই বিশ্বকাপের আকর্ষনীয় চরিত্র।




