সাম্বার তাল না সামুরাইয়ের ধার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শুরুটা নড়বড়ে। সাম্বার ছন্দ থেকে আলোকবর্ষ দূরে। সেই ধাক্কা কাটিয়ে পেখম মেলতে শুরু করেছে ব্রাজিল। হাইতি আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হৃদয়কাড়া ফুটবলে বিশ্বকাপে তাদের অন্যতম ফেভারিট ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা। হেক্সা অভিযানের নকআউট পর্বে আজ সেই ব্রাজিল মুখোমুখি জাপানের। ব্লু সামুরাইখ্যাত জাপান এখন আর এলেবেলে দল নয়। কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকেই গত বছর তারা হারিয়েছিল ৩-২ গোলে। আজ হিউস্টনে তাই জাপানকে সমীহ করেই নামবেন আনচেলত্তি।
প্রথম ম্যাচে হতাশার ড্রর পর আনচেলত্তি অবশ্য দলের উন্নতিতে খুশি। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের পর আর গোল হজম করেনি তারা। সর্বশেষ ছয় ম্যাচে তাদের জয় পঁাচটি। অথচ এর আগে খেলা ১২ ম্যাচে জয় এসেছিল ৫টি। তারপরও আনচেলত্তি পা রাখছেন মাটিতেই, ‘আমরা পরিপূর্ণ নই, তাই উন্নতি করতেই পারি। যেমন বল পায়ে আরও গতি বাড়ানো। তবে প্রথম ম্যাচের পর দলের উন্নতিতে আমি খুশি। এখন আমরা নকআউটে, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের এটাই সময়।’
দুই দলের ১৪ দেখায় জাপান জিতেছে শুধু একবার। সেই জয়টা এসেছিল সর্বশেষ দেখায় দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও! ২০ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল দিয়ে ম্যাচ জিতেছিল জাপান। কোচ হাজিমে মরিয়াসু সেটা অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরলেও তা নিয়ে বসেও নেই। কারণ চোটের কারণে কোচ মরিয়াসু পাচ্ছেন না সেই ম্যাচে খেলা অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো, দুই উইঙ্গার কাওরু মিতোমা ও তাকেফুসা কুবো আর ফরোয়ার্ড তাকুমি মিনামিনোকে। তা ছাড়া বিশ্বকাপ নকআউটে একটিও জয় নেই জাপানের। তাই বাস্তববাদী মরিয়াসু বলেছেন, ‘তারা আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়ে মাঠে নামবে। আমরা এমন এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যারা জয়ের জন্য ক্ষুধার্ত। আমি এ ম্যাচটির অপেক্ষায় আছি।’
ট্যাকটিক্যালি এ ম্যাচটা উপভোগ্যই হতে যাচ্ছে। জাপান মধ্যমাঠ সংকুচিত করে দ্রুতগতিতে প্রতিআক্রমণে যায়, তাই ব্রাজিলের ফুলব্যাকরা অতিরিক্ত এগিয়ে এলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের অরক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সেলেসাওদের যেকোনো মুহূর্তের মনোযোগের ঘাটতিকে জাপান কাজে লাগাতে মুখিয়ে থাকবে ৯০ মিনিট জুড়ে। জাপানের ফরোয়ার্ডদের অসাধারণ জায়গা বোঝার ক্ষমতার জন্য তারা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে পারে। আর প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক উইং-ব্যাকদের রেখে যাওয়া খালি জায়গাগুলো ব্যবহার করতে পারে দারুণভাবে।
বল পজিশনে এগিয়ে থাকা দলগুলোর মুখোমুখি হলে জাপান সাধারণত সুশৃঙ্খল ‘মিড-ব্লক’ (মাঝমাঠের রক্ষণব্যূহ) ব্যবহার করে। তারা প্রথমে প্রতিপক্ষের চাপ সামলে নেয়, এরপর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সরাসরি ওপরের দিকে নিখুঁত পাস বাড়ায়। ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের চ্যালেঞ্জ এটাই। জাপানের বল ছাড়া দৌড়ানো এবং ফাইনাল থার্ডে অনবরত জায়গা বদলের জন্য ব্রাজিলের সেন্ট্রাল ডিফেন্সের জুটি কঠিন পরীক্ষায় পড়তে পারেন আজ।
এমন ট্যাকটিক্যাল লড়াই জিততে নিজের কৌশল নিশ্চয়ই ঠিক করে রেখেছেন কার্লো আনচেলত্তি। রাফিনিয়া না থাকায় সেই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়েই থাকবেন রায়ান। শারীরিক শক্তি, গতি, ট্রানজিশনের সময় ফাঁকা জায়গায় আক্রমণ করার ক্ষমতা, আকাশে ভেসে আসা বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর বল ছাড়া প্রতিপক্ষকে চেপে ধরায় তিনি অনন্য।
হাইতির বিপক্ষে স্নায়ুচাপ মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসে রূপ নেয় রায়ানের। এজন্য আনচেলত্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি, ‘আমার জীবনে সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেছে। মাত্র দ্বিতীয়বার দলে ডাক পেয়েই বিশ্বকাপে চলে এসেছি। অথচ গত বিশ্বকাপের সময়ও আমি নির্বাচনের লিফলেট বিলি করেছি! এজন্য আনচেলত্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
ব্রাজিলের জন্য স্বস্তির ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ছন্দে থাকা। তিন ম্যাচে চার গোল করে ফেলেছেন তিনি। পাকেতার সঙ্গে ফ্ল্যামেঙ্গোয় কাটানো দিনগুলোর প্রভাব পড়েছে মাঠে। ফিট হয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নেইমারের নামাটাও শক্তি বাড়িয়েছে ব্রাজিলের। সেই ম্যাচে ২৪ বার বল ছুঁয়েছিলেন নেইমার, ফাইনাল থার্ডে সাফল্য ছিল ৮৯ শতাংশ। জাপান তার প্রিয় প্রতিপক্ষও। ব্রাজিলের জার্সিতে সর্বোচ্চ ৯ গোল জাপানের বিপক্ষেই করেছেন নেইমার। চোট কাটিয়ে ফিরে প্রিয় দলের বিপক্ষে গোল করতে নিশ্চয়ই মুখিয়ে থাকবেন তিনি। তাহলেই ভোঁতা হতে পারে সামুরাইয়ের ধার।




