ফ্রান্সের ভয়ংকর ত্রয়ী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এমএসএন! বার্সেলোনায় মেসি, সুয়ারেস, নেইমার ত্রয়ীকে ডাকা হতো এ নামেই। ২০১৫ সালে এই ত্রয়ী করেছিলেন ১২২ গোল। রিয়াল মাদ্রিদের টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী দলের পেছনেও মূল অবদান ‘বিবিসি’ বা বেল-বেনজেমা-ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ত্রয়ীর। ২০০২ সালে থ্রি আর রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনহো বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ব্রাজিলকে।
তাদের মতোই বিধ্বংসী হতে পারেন ফ্রান্সের ভয়ংকর ত্রয়ী এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে। গ্রুপ পর্বেই চারটি করে গোল করেছেন এমবাপ্পে আর দেম্বেলে। ওলিসে করে ফেলেছেন তিনটি অ্যাসিস্ট। বারমুডার মতো এই ট্রায়াঙ্গলও ভয়ংকর এবারের বিশ্বকাপে।
এই ত্রয়ীই এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে গতিশীল ও ভয়ংকর, যাদের একমাত্র লক্ষ্য বিশ্বজয়ের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো। গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের ১০ গোলের ৮টিই করেছেন তারা। এমবাপ্পে আর দেম্বেলে করেছেন সমান চারটি করে গোল। আর ওলিসের অ্যাসিস্ট তিনটি। এমবাপ্পে অ্যাসিস্ট করেছেন দুটি, দেম্বেলে একটি। তারা মাঠে একে অন্যকে খুঁজে নেন, পরিপূরক হিসেবে কাজ করেন আর আক্রমণে যার যার ভূমিকা ফুটিয়ে তোলেন। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন না। এজন্যই গোলকিপারকে একা পেয়েও দেম্বেলে পাস বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এমবাপ্পেকে। ফরাসি অধিনায়ক এর প্রতিদান দিয়েছেন নরওয়ের বিপক্ষে দেম্বেলেকে দুটি গোলের অ্যাসিস্ট করে।
নরওয়ের বিপক্ষের ম্যাচটিকে বলা হচ্ছিল এমবাপ্পে-হলান্ডের লড়াই। সেই বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই শেষ পর্যন্ত রূপ নিল ‘দেম্বেলে শো’তে। মাত্র ৩২ মিনিটের হ্যাটট্রিকে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন দেম্বেলে। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক। স্ট্রাইকার পজিশনে এমবাপ্পে থাকায় উইংয়ে খেলতে পিএসজির সেই চিরচেনা দেম্বেলেকে খুঁজে পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছিল। পুরো বিশ্ব তাকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও দেম্বেলে নিজে দমে যাননি। তারই প্রমাণ দিয়েছেন নরওয়ের বিপক্ষে।
নরওয়ের বিপক্ষে গোল পাননি এমবাপ্পে। তারপরও তার নামের পাশে দুটি অ্যাসিস্ট যোগ হয়েছে। গোল্ডেন বুট আর এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় তার হাতে আছে এখনো। সোফাস্কোরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তার নেওয়া শটের ২৫ শতাংশ গোলে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা এই আসরের যেকোনো আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একজন দুর্দান্ত পাসার ছাড়া তো আর গোল আসে না আর ঠিক এখানেই নিজের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন মাইকেল ওলিসে। এবারের মৌসুমে ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ প্লে-মেকার ছিলেন বায়ার্ন মিউনিখের এই তারকা। ফ্রান্সের হয়েও তিনি একই কাজ করছেন। এই টুর্নামেন্টে যৌথ সর্বোচ্চ তিনটি অ্যাসিস্ট তার।
মাঠের ঠিক মাঝখানে ওলিসে নিজের একদম সঠিক জায়গাটি খুঁজে পেয়েছেন। ফরাসিদের পুরো খেলাটাই এখন তার পায়ের জাদু ধরে আবর্তিত হচ্ছে আর প্রতিপক্ষের জন্য তৈরি হচ্ছে চরম বিপদ। তার লক্ষ্যই থাকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনের পেছন দিয়ে থ্রু-বল বাড়ানো, যা বিদ্যুৎগতিতে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করতে পারেন এমবাপ্পে। সেনেগাল আর ইরাক এই কৌশলের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে। আজ সুইডেনকে খুঁজে বের করতে হবে কীভাবে এই ত্রয়ীকে থামানো যায়। নইলে বিধ্বস্ত হতে হবে নকআউটের মতো বড় মঞ্চেও। এই ত্রয়ীর সঙ্গে দেজেরি দুয়েকে যোগ করলে জাদুকরী চতুষ্টয় তৈরি হয় ফ্রান্সের। ১৯৮২ বিশ্বকাপে মিশেল প্লাতিনি, জঁ তিগানা, অ্যালাইন জিরেসে ও বার্নার্দ গেনঘিনিকে নিয়ে ফ্রান্স তৈরি করেছিল ‘ম্যাজিক স্কয়ার’। তারা শুধু পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেই সেমিফাইনালের হারা ম্যাচটিতেই একসঙ্গে খেলেছিলেন। ম্যাচ হারলেও সেভিয়ার সেই লড়াইটি ফুটবল ইতিহাসে এক রূপকথাই হয়ে আছে।
অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পরও ফ্রান্স পেনাল্টি শুটআউটে হেরে গিয়েছিল। তবে ফরাসিরা সেদিন মাঠে যে চোখধাঁধানো শৈলী ও নান্দনিকতা দেখিয়েছিলেন, সেটিই খাঁটি ফরাসি ফুটবল। এর ঠিক দুই বছর পর যখন তারা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে, ততদিনে গেনঘিনির জায়গায় দলে এসেছিলেন রক্ষণাত্মক কিন্তু দারুণ স্টাইলিশ লুইস ফার্নান্দেজ। তবে ফরাসি ফুটবলের সেই মূল দর্শনটি অপরিবর্তিতই ছিল। ফরাসি ফুটবল মানেই ছিল ‘লা গ্লোয়ার’ বা গৌরবগাথা। এবারও সেই গৌরবগাথা গড়তে মুখিয়ে এমবাপ্পে, ওলিসে, দেম্বেলে, দেজেরি দুয়েরা।




