খেলার বদলে দর্শকদের যন্ত্রণা দেখাচ্ছে বিটিভি

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উৎসব। চার বছর পরপর এই মহাযজ্ঞকে ঘিরে বাংলাদেশের লাখো দর্শকের রাতজাগা, উচ্ছ্বাস আর আবেগের কোনো শেষ থাকে না। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সেই আনন্দের বড় অংশই যেন পরিণত হয়েছে বিরক্তি আর ক্ষোভে। কারণ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)— যারা বিশ্বকাপ সম্প্রচারের মূল স্বত্ব কিনেছে— তাদের পর্দায় খেলা দেখা হয়ে উঠেছে এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা।
খেলা শুরুর বাঁশি বাজতেই বিটিভির পর্দায় শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। পর্দা জুড়ে ঝিরঝিরে ছবি, সিগন্যালের ওঠানামা, শব্দ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার অভিযোগ করছেন দেশের বিভিন্ন স্থানের দর্শক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ছে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কেউ লিখছেন, ‘গোল হলো কি না, বুঝতেই পারলাম না’; কেউ আবার ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘বিশ্বকাপের সঙ্গে বিটিভি বোনাস হিসেবে তুষারপাতও দেখাচ্ছে।’
অথচ এই বিটিভিই বিশ্বকাপ সম্প্রচারের মূল স্বত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য সম্প্রচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই স্বত্বের একটি অংশ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। যারা শুধু অপারেটর বা বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে খেলা দেখছেন, তারা তুলনামূলক ভালো মানের সম্প্রচার পাচ্ছেন। অথচ যেসব দর্শক বিটিভির ওপর ভরসা করে বিনামূল্যের সম্প্রচার দেখছেন, তাদের অনেকের কাছেই বিশ্বকাপ উপভোগ করা হয়ে উঠেছে যন্ত্রণাদায়ক।
প্রশ্ন উঠছে— রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের মূল দায়িত্ব কী? শুধু স্বত্ব কিনে ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করা, নাকি দেশের সাধারণ দর্শকদের মানসম্মত সেবা দেওয়া? শুধু অপারেটররা বেসরকারি টিভি চ্যানেল থেকে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রীয় চ্যানেলকে চাপের মুখে রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিটিভি।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনো বিটিভির ওপর নির্ভরশীল। সবাই তো আর স্মার্ট টেলিভিশন, উচ্চগতির ইন্টারনেট কিংবা বেসরকারি পে-টিভি সেবার নাগাল পান না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বিটিভিই বড় টুর্নামেন্ট দেখার প্রধান ভরসা। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের সম্প্রচার যদি বারবার ব্যাহত হয়, তা হলে তা শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতাই নয়; এটি দর্শকদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলারও প্রশ্ন তোলে।
কেন এমন হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে কথা হয় বিটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি কারিগরি দিক। প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা কারিগরি সমস্যা হচ্ছে কি না, তা ভালো বলতে পারবেন।’ তবে প্রকৌশল বিভাগে যোগাযোগ করে কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
দর্শকরা বলছেন, বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়; এটি কোটি মানুষের আবেগের অংশ। সেই আবেগের সঙ্গে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন জড়িয়ে যায়, তখন বিষয়টি আর নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। বিটিভি যদি সত্যিই জনগণের টাকায় পরিচালিত একটি গণমাধ্যম হয়ে থাকে, তাহলে তাদের কাছে দর্শকদের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। বিশ্বকাপের স্বত্ব কিনে তা থেকে আয় করার সুযোগ তৈরি করা দোষের কিছু নয়; কিন্তু সেই আয় নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি নিজেদের দর্শককেই নিম্নমানের সেবা দেওয়া হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
কেবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ বি এম সাইফুল হোসেন সোহেল বলছিলেন, ‘আমাদের কোনো টেলিভিশন টাকা দেয় না, আমরা কোনো একটি চ্যানেল ইচ্ছা করে খারাপ করে রাখব। আমাদের টাকা দেন গ্রাহক। তাই গ্রাহককে সেবা দেওয়াই আমাদের একমাত্র দায়িত্ব।’
খেলা শুরুর সময় সমস্যা হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, এটি অনেকটা কারিগরি আলোচনা। সারা দিন বিটিভি চলে ‘সি’ ব্যান্ডে। কিন্তু খেলা দেখাতে হয় ‘কে’ ব্যান্ডে। এটা অবশ্য পাইরেসি ঠেকানোর জন্য ফিফার নির্দেশ। ‘সি’ থেকে ‘কে’ ব্যান্ডে যেতে যে কয়েক মিনিট সময় লাগে ওই সময়টাতেই সমস্যা হতে পারে— যোগ করলেন সাইফুল হোসেন।
ফুটবলপ্রেমীরা খুব বেশি কিছু চান না। তারা শুধু চান, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পর্দা যেন ঝিরঝিরে না হয়; গোলের সময় যেন ছবি হারিয়ে না যায়; চার বছরের অপেক্ষার সেই আনন্দটুকু যেন নির্বিঘ্নে উপভোগ করা যায়। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে কয়েক সপ্তাহ পর; কিন্তু দর্শকদের মনে বিটিভির সেবা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।





