বাবা হোর্হের হাতেই তৈরি এই মেসি

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন তিনি। যার পায়ে জাদু দেখেছে পৃথিবী, যার পায়ে লুটিয়ে পড়ে রেকর্ড-কীর্তিগাথা— তিনি লিওনেল মেসি। কিন্তু মেসি হওয়ার গল্পের শুরুটা স্টেডিয়ামের আলোয় নয়, শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার রোজারিওর এক সাধারণ বাড়িতে। সেখানে একজন বাবা ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন। দিনের পরদিন পরিশ্রম করতেন। রাতে ফিরতেন পরিবারের কাছে। নিজের জন্য ছিল না বড় কোনো স্বপ্ন, চেয়েছিলেন ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। সেই বাবার নাম— হোর্হে হোরাসিও মেসি।
৬৮ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে মারা গেছেন মেসির বাবা। শুধু মেসির বাবা হিসেবেই নয়, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন হিসেবেও হোর্হের বিদায়টা বিশেষ এক শূন্যতা তৈরি করেছে। কারণ লিওনেল মেসির গল্প যতটা একজন অসাধারণ ফুটবলারের গল্প, ততটাই একজন বাবার গল্পও। যে বাবা ছেলের প্রতিভায় বিশ্বাস করে নিজের পরিচিত জীবন ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। যে বাবা ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে লড়েছিলেন। যে বাবা মাত্র ১৩ বছরের কিশোরকে নিয়ে বার্সেলোনায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। আর পরবর্তী সময়ে হয়েছিলেন সেই ছেলের ক্যারিয়ারের নেপথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। মেসি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে— তার পথটা শুরু হয়েছিল হোর্হের হাত ধরেই।
রোজারিওর সাধারণ এক পরিবার
১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম হোর্হে মেসির। খ্যাতির সঙ্গে তার পরিচয় অনেক পরে। যৌবনে তিনি কাজ করেছেন একটি ধাতব কারখানায়। জীবন ছিল সাদামাটা, পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রমে ভরা। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে কাজে যেতেন, ফিরতেন রাতের খাবারের সময়। হোর্হে ও সেলিয়া কুচিত্তিনির সংসারে চার সন্তান— লিওনেল মেসি, রোদ্রিগো, মাতিয়াস ও মারিয়া সল।
সন্তানদের নিয়ে জীবনটা ছিল আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতোই। কিন্তু সেই সাধারণ পরিবারের ছোট ছেলে মেসির পায়ে যখন ফুটবল উঠল, তখন ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল সবকিছু। রোজারিওর গ্রানদোলিতে খেলত ছোট্ট লিও। তার দাদি সেলিয়া ছিলেন নাতির প্রতিভার বড় ভক্ত। একদিন গ্রানদোলির কোচ সালভাদোর আপারিসিওকে তিনি বলেছিলেন, ‘জিততে চাইলে আমার নাতিকে খেলান, ও ম্যাচ বাঁচিয়ে দেবে।’ কোচ ছিলেন চিন্তিত। এতটুকু ছেলে, পা না আবার ভেঙে যায়। এসব কথা শুনে হোর্হে হাসতেন। কিন্তু ছেলের মধ্যে যে বিশেষ কিছু আছে, সে বিশ্বাস তার ছিল।
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
খুব ছোট বয়সেই মেসির শরীরে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসা প্রয়োজন। সেই চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি। হোর্হে তখন আকিন্দার কারখানায় কাজ করতেন। তিনি চেষ্টা করলেন বিভিন্ন জায়গা থেকে সহায়তা পাওয়ার। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত সামনে এলো এমন একটি সুযোগ, যা মেসি পরিবারের জীবনকে চিরতরে বদলে দিতে পারে। বার্সেলোনা হাত বাড়াল মেসির দিকে। কিন্তু সেই সুযোগের সঙ্গে ছিল বিশাল ঝুঁকি। ছেলেকে নিয়ে স্পেনে যেতে হবে। এর মানে শুধু একটি দেশ বদলানো নয়। চাকরি ছেড়ে দেওয়া। পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসা। পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া। আর মাত্র ১৩ বছরের একটি ছেলেকে নিয়ে অচেনা দেশে নতুন জীবন শুরু করা।
হোর্হে তবু সিদ্ধান্ত নিলেন। ছেলের ভবিষ্যতের জন্য নিজের নিরাপত্তা বিসর্জন দিলেন। পরে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘কাজের জায়গা ও একটি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় দুই বছর পর্যন্ত লিওর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হয়েছিল। এরপর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তখন আর পেছনে ফেরার উপায় ছিল না।’ কারণ হোর্হে বুঝতে পেরেছিলেন তার ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সামনে।
বার্সেলোনার পথে
গ্রানদোলি থেকে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, সেখান থেকে বার্সেলোনা। লিওর প্রতিভা যত সামনে আসছিল, হোর্হে ততই বুঝতে পারছিলেন— এই ছেলের জন্য বড় একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। অবশেষে ১৩ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে বার্সেলোনায় পাড়ি জমালেন মেসি। একদিকে নতুন দেশে ছেলের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে তাকে ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া— দুটো দায়িত্বই কাঁধে নিলেন হোর্হে।
পরিবারের সবাই একসঙ্গে যেতে পারেননি। ফলে এই নতুন জীবনের শুরুটা ছিল আনন্দের পাশাপাশি বিচ্ছেদেরও। একজন বাবা ও তার কিশোর ছেলে অচেনা শহরে। তখন তারা কেউই জানতেন না, এই যাত্রা একদিন ফুটবল ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেবে। যদি সেদিন হোর্হে ছেলেকে নিয়ে বার্সেলোনায় না যেতেন? হয়তো আজকের ফুটবল পৃথিবীটাই অন্যরকম হতো।
বাবা থেকে ম্যানেজার
বার্সেলোনায় মেসির গল্প দ্রুত এগোতে থাকে। যুব দলে একের পর এক গোল। প্রথমে প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভা, তারপর বিস্ময়, এরপর তারকা, আর একসময় বিশ্বের সেরা ফুটবলার। মেসি যখন মাঠে নিজের জায়গা তৈরি করছেন, তখন মাঠের বাইরে তার জন্য আরেকটি জগৎ সামলাচ্ছেন হোর্হে। তিনি পেশাদার এজেন্ট হিসেবে কোনো প্রশিক্ষণ নেননি। কিন্তু ছেলের ক্যারিয়ার সামলাতে সামলাতে শিখে নেন চুক্তি, আলোচনা, ক্লাব, স্পনসর— সবকিছু। ধীরে ধীরে বাবা হয়ে ওঠেন ছেলের প্রধান প্রতিনিধি।
বার্সেলোনায় মেসির একের পর এক চুক্তি নবায়নের সময় হোর্হে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছেলের স্বার্থ রক্ষা করেন, আলোচনায় বসেন, সিদ্ধান্ত নেন। তার কাজের মূল দর্শন ছিল খুব সরল— মেসি যেন শুধু ফুটবল নিয়ে থাকতে পারে। বাইরের পৃথিবীর চাপ যতটা সম্ভব নিজের কাঁধে নেওয়া, ছেলেকে মাঠের বাইরে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা থেকে দূরে রাখা, এটাই ছিল হোর্হের অন্যতম দায়িত্ব।
পৃথিবী যখন মেসিকে দেখেছে, হোর্হে তখন নেপথ্যে
মেসির খ্যাতি যত বাড়তে থাকে, হোর্হে ততই আলো থেকে দূরে থাকতে চান। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকার বাবা হয়েও তিনি নিজেকে সামনে আনেননি। বরং ছেলের চারপাশের জগৎটাকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। মেসির ক্যারিয়ার, চুক্তি, ব্যবসা— সবকিছুর পাশাপাশি পরিবারের সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। হোটেল, বিজ্ঞাপনসহ ফুটবল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগেও যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু এসবের কোনোটিই তার কাছে ছেলের চেয়ে বড় ছিল না। হোর্হের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তিনি ছিলেন মেসির বাবা।
সবচেয়ে বড় সমালোচকও ছিলেন বাবা
মজার বিষয়, হোর্হে কখনোই ছেলের অন্ধ প্রশংসাকারী ছিলেন না। মেসির নিজের ভাষায়, বাবা ছিলেন তার সবচেয়ে বড় সমালোচকদের একজন। মেসি দুর্দান্ত একটি ম্যাচ খেললেও হোর্হে হয়তো খুঁজে বের করতেন তার একটি ভুল। একবার মেসি বলেছিলেন, ভালো একটা ম্যাচ খেলার পরও তার বাবা তাকে বলতেন, ‘একটা ভুল করেছ।’ কথাটা হয়তো কঠিন শোনায়। কিন্তু মেসির জন্য সেটিই ছিল প্রেরণা। কারণ পৃথিবী যখন তাকে সেরা বলছে, তখনো একজন মানুষ তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন আরও ভালো হওয়া সম্ভব।
মেসির জীবনের বড় বাঁকগুলোতেও...
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হোর্হের নাম। ২০২১ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির দীর্ঘ সম্পর্কের অবসান হয়। ক্লাবের আর্থিক সংকটের মধ্যে চুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত মেসিকে ছাড়তে হয় ন্যু ক্যাম্প। সেই কঠিন সময়েও হোর্হে ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। তারপর মেসির প্যারিস সেন্ত জার্মেইনে যাওয়া। কয়েক বছর পর ইন্টার মায়ামিতে পাড়ি দেওয়া। এই সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রেও হোর্হে রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা।
মেসির মন পড়েছিল রোজারিওতে
হোর্হের অসুস্থতা দীর্ঘদিনের। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময়ও তার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। মেসি তখন জাতীয় দলের সঙ্গে। মাঠে দেশের হয়ে লড়ছেন। আর হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে রোজারিওতে অসুস্থ বাবা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলের পর তার চোখের জল অনেকের নজরে এসেছিল। সেটি ছিল আনন্দের অশ্রু, কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালে ছিল গভীর উদ্বেগ। মেসি তখন বাবার অসুস্থতার খবর নিচ্ছিলেন নিয়মিত। এমনকি বিশ্বকাপ চলাকালীন তাকে দেখতে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর দ্রুত রোজারিও ছুটে যান মেসি। প্রায় দুই মাস পর বাবার কাছে ফিরেছিলেন তিনি।
তারপর এলো সেই শনিবার
রোজারিওতেই হোর্হের শেষ দিনগুলো কেটেছে। কখনো হাসপাতালে, কখনো নিজের বাড়িতে। পাশে ছিলেন স্ত্রী সেলিয়া। কখনো মনে হয়েছে, পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু অসুস্থতা ছিল গুরুতর। শেষ পর্যন্ত শনিবার থেমে গেল সেই লড়াই। ৬৮ বছর বয়সে চলে গেলেন হোর্হে।
সেই মানুষটি, যিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন সন্তানের জন্য। একজন বাবা, যিনি নিজের স্বপ্নের চেয়ে ছেলের স্বপ্নকে বড় করেছিলেন। যার ত্যাগ ও পরিশ্রমেই তৈরি হয়েছেন আজকের লিওনেল মেসি।









