১০০ বছরের ইতিহাস
গোলকিপারের জার্সি কেন আলাদা হয়?

আজকের দিনে যেকোনো ফুটবল ম্যাচে দেখা যায়—মাঠের অন্য ১০ জন খেলোয়াড় নির্দিষ্ট ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে দৌড়াচ্ছেন, আর পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষকের গায়ে শোভা পাচ্ছে সম্পূর্ণ আলাদা রঙের জার্সি। কিন্তু ফুটবলের সূচনালগ্নে গোলরক্ষক ও বাকি খেলোয়াড়দের মধ্যে পোশাকে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমনকি সতীর্থদের সঙ্গে গোলরক্ষককে আলাদা করার একমাত্র উপায় ছিল তার মাথার একটি টুপি!
উনিশ শতকের শেষের দিকে ফুটবল দলগুলো ধীরে ধীরে নিজস্ব ক্লাব কালার তৈরি করতে শুরু করে। তবে গোলরক্ষক অন্য সব খেলোয়াড়ের মতো একই পোশাক পরতেন। কিন্তু এতে বড় সমস্যা দেখা দিত। কারণ, গোলরক্ষকের দায়িত্ব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডি-বক্সের ভেতর তিনি হাত দিয়ে বল ধরতে পারতেন, যা অন্য খেলোয়াড়দের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। ডি-বক্সের ভেতর জটলার মধ্যে রেফারিদের পক্ষে গোলরক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। অবশেষে ১৯০৯ সালে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের ফুটবলে প্রথমবারের মতো গোলরক্ষকদের জন্য অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে আলাদা রঙের জার্সি পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) প্রথমে কেবল লাল, রয়্যাল ব্লু এবং সাদা রঙ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে এই তালিকায় যুক্ত হয় ‘সবুজ’ রঙ। আর তখন থেকেই সবুজ রঙটি গোলরক্ষকদের জার্সির সঙ্গে ঐতিহ্য হিসেবে মিশে যায়। সে যুগে খুব কম ক্লাবই তাদের মূল পোশাক হিসেবে সবুজ ব্যবহার করত। ফলে ফিল্ডের অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে গোলরক্ষকের জার্সির মিল থাকত না। শুরুর দিকে গোলরক্ষকেরা মূলত তীব্র শীত থেকে বাঁচতে উলের তৈরি ভারী সোয়েটার ও ফুলহাতা জার্সি পরতেন। তবে ১৯৭০-এর দশকে রঙিন টেলিভিশনের আগমন এবং পোশাকের আন্তর্জাতিক কড়াকড়ি শিথিল হওয়ার পর গোলরক্ষকদের পোশাকে বৈচিত্র্য আসতে শুরু করে। চেলসির পিটার বোনেত্তি বা কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের ফিল পার্কেসরা প্রথাগত সবুজের বাইরে গিয়ে লাল রঙের জার্সি পরা শুরু করেন। অন্যদিকে, কিছু কিংবদন্তি গোলরক্ষক তাদের নির্দিষ্ট রঙের পোশাকে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিন পরতেন সম্পূর্ণ কালো জার্সি, যা তাকে এনে দিয়েছিল ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ বা কালো মাকড়সা তকমা। আবার ইংল্যান্ডের পিটার শিলটন ১৯৭০-এর দশকে পরতেন ধবধবে সাদা পোশাক।
১৯৯০-এর দশকে গোলরক্ষকদের জার্সিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। হালকা ফ্যাব্রিক এবং জ্যামিতিক ও উজ্জ্বল নকশার সংমিশ্রণে তৈরি হতে থাকে জার্সি। ১৯৯০ বিশ্বকাপের কলম্বিয়ার রেনে হিগুইতার বৈচিত্র্যময় জামা, ১৯৯২ ইউরোতে ডেনমার্কের পিটার স্মাইকেলের রঙিন জার্সি, কিংবা ১৯৯৪ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হোর্হে ক্যাম্পোসের নিজ হাতে ডিজাইন করা ঝলমলে পোশাক বিশ্ব ফুটবলের ফ্যাশনে নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গোলরক্ষকদের এই বদলে যাওয়ার গল্পের সঙ্গে গ্লাভস ব্যবহারের ইতিহাসও আছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএবি) নিয়ম অনুযায়ী গ্লাভস পরা বাধ্যতামূলক নয়, এটা ঐচ্ছিক বিষয়! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ২০০৪ সালের ইউরোতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে পর্তুগিজ গোলরক্ষক রিকার্দোর কথা, যিনি হাত থেকে গ্লাভস খুলে খালি হাতে পেনাল্টি ঠেকিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন।
ফিফার অফিশিয়াল ‘ল অব দ্য গেম’-এর চার নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রতি ম্যাচে গোলরক্ষককে অবশ্যই মাঠের অন্য খেলোয়াড় এবং ম্যাচ অফিশিয়াল বা রেফারিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রঙের পোশাক পরিধান করতে হবে। বর্তমান সময়ে নাইকি কিংবা অ্যাডিডাসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি ক্লাবের জন্য প্রায় একই টেমপ্লেটের গোলরক্ষক জার্সি সরবরাহ করে থাকে।
একশ বছর আগে টুপি মাথায় পশমি সোয়েটার জড়িয়ে পথচলা শুরু করা গোলরক্ষকেরা এখন পারফর্ম্যান্সের পাশাপাশি জার্সি দিয়েও ফুটবল মাঠে নজর কাড়েন। সেদিনের সেই সাধারণ সবুজ পোশাকই আজকের আধুনিক ফুটবলের অন্যতম মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।








