ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে উয়েফা, এএফসি, কনকাকাফের যৌথ বিবৃতি

সংগৃহীত ছবি
আরও চাপে পড়লেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। উয়েফা, এএফসি, কনকাকাফ-একজোট হয়ে ফিফা এবং জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। ফিফার বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ এনেছে তারা। পাশাপাশি এও স্পষ্ট করে দিয়েছে , বিশ্বকাপ ফুটবলের অংশীদারত্ব) বিক্রির পরিকল্পনাটি নিছক যোগাযোগের ভুল ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত।
ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কোনো দ্বিধা না করেই দাবি করেছে , ফিফার প্রতি তাদের আস্থা ভেঙে গেছে।
ইনফান্তিনো নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেও তাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিন মহাদেশীয় কনফেডারেশনের এই যৌথ বিবৃতিটি এ পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ, যেখানে ফিফার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইনফান্তিনো তার স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন।
উয়েফা, এএফসি এবং কনকাকাফের যৌথ বিবৃতি
প্রিয় ফুটবল পরিবার,
ফুটবল হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যৌথ আবেগ। এটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়। এটি খেলোয়াড়, সমর্থক, ক্লাব, সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং এর ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের।
সদস্যদের প্রতিনিধিত্বকারী কনফেডারেশন হিসেবে আমরা আজ একসঙ্গে এই চেতনায় কথা বলছি। গত এক দশকে ফুটবলের যে অগ্রগতি হয়েছে তা বাস্তব। কিন্তু সেই অগ্রগতি কখনো একজন ব্যক্তির একক অবদান ছিল না। এটি ফিফা, কনফেডারেশন, সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং এই খেলার পেছনে জীবন উৎসর্গ করা হাজার হাজার মানুষের যৌথ প্রচেষ্টার ফসল।
টুর্নামেন্টের সম্প্রসারণ, ২০৩০ ও ২০৩৪ ফিফা বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশের অনুমোদন, অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে সম্পদ বণ্টন, এসবই যৌথ অর্জন, যা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বিষয়টি অর্থের নয়। কনফেডারেশনগুলো সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগের জন্য ফিফার বিশাল রিজার্ভ ফান্ড থেকে দায়িত্বশীল বণ্টনের আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি ভীতিকর তথ্য ছড়িয়ে আমাদের সদস্যদের বিভ্রান্ত করার যে চেষ্টা করা হচ্ছে— এ বিষয়ে কোনো সদস্য অ্যাসোসিয়েশন তাদের অর্জিত সহায়তা হারাচ্ছে না।
এটা আরও মৌলিক একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে, ফুটবলের সততা এবং এটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নির্বাচিতদের সততা। ফুটবলের নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি ক্ষমতা নিজের কাছে ধরে রাখা বা ক্ষমতা দাবি করার বিষয় নয়। এটি সেই ফুটবল পরিবারের প্রতি একটি দায়িত্ব ও সেবা, যারা আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছে।
প্রতারণার মাধ্যমে যখন বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়, কোনো ব্যক্তি যখন তাকে ক্ষমতা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বে নিজেকে বসায়, তখন সেই দায়িত্ব অমান্য করা হয়। সদস্য অ্যাসোসিয়েশন এবং ভাইস প্রেসিডেন্টদের কাছে পাঠানো ফিফার সাম্প্রতিক চিঠিতে স্বীকার করা হয়েছে যে প্রক্রিয়াটিতে ভুল ছিল। তারা এটিকে 'যোগাযোগের ব্যর্থতা' হিসেবে দেখছে, কিন্তু ফুটবল বিশ্ব প্রকৃতপক্ষে যা দেখেছে তা হলো 'বিচারের চরম ব্যর্থতা'। উপযুক্ত আলোচনা ছাড়া একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে প্রস্তাব আনা এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলো নিয়মা পর্যালোচনার আগেই একটি নির্দিষ্ট সীমার দিকে তা ঠেলে দেওয়া কোনো অসাবধানতার ফল নয়— এটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যেন তদন্ত বা তদারকির সুযোগ সীমিত থাকে।
প্রস্তাবটি যে নিজেই জন্মগতভাবে ভুল ছিল, তা স্বীকার করা হয়নি। ফিফা বিশ্বকাপের একটি অংশ বিক্রি করার চেষ্টা করা যে কত বড় বিচারের ভুল ছিল, সেটির কোনো স্বীকৃতি এখনো নেই। এটি শুধু কোনো কার্যপ্রণালীর ভুল ছিল না, বরং যে সংস্থাগুলোকে সেবা দেওয়ার জন্য ফিফা টিকে আছে, তাদের সঙ্গেই বিশ্বাসভঙ্গ করা।
ফিফা এই ঘটনাগুলোর ওপর ফিফা কাউন্সিলের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু তারা আবারও এটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যে এমন এক গভীর বিচারবুদ্ধিহীনতার মুখে সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ ও সম্পূর্ণ স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ দ্বারা পর্যালোচনা পরিচালনা করা প্রয়োজন, যা ফিফা নিজে, তার কর্মী বা ফুটবলের কোনো অংশীদার দিয়ে হবে না। এই পর্যালোচনার পরিচালনায় ফিফা প্রশাসনের কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়।
আগের চিঠি অনুযায়ী, নথি সংরক্ষণের বিষয়ে উয়েফার নির্দেশনা মেনে সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথি ও রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। ফিফার নিজস্ব চিঠি থেকেও এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, মরক্কোতে অনুষ্ঠিত নেতৃত্বের বৈঠকে মাত্র একজন নির্বাচিত কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। কোনো ফিফা কাউন্সিল সদস্য বা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। শুধু ফিফায় কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মীদের নিয়ে গঠিত ম্যানেজমেন্ট কমিটি উপস্থিত ছিল।
ফিফা সদর দপ্তর জুরিখের মূল কর্মীদের কাছে না গিয়ে সাম্প্রতিক এই বৈঠকটি, যেখানে ফিফা ম্যানেজমেন্ট কমিটির পুরো দলের বদলে মাত্র কয়েকজন সদস্যকে বিদেশে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। এটা আমাদের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং এটি সেই একই আচরণকে অব্যাহত রাখে যা আমাদের আজ এই পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছে। এটি খেলার কোনো অভিভাবকের আচরণ নয়, বরং এমন একজনের আচরণ যিনি বিশ্বাস করেন যে খেলাটি তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।
যেখানে জবাবদিহি থাকা উচিত ছিল সেখানে রয়েছে নীরবতা, যেখানে উন্মুক্ততা থাকা উচিত ছিল সেখানে রয়েছে দূরত্ব। ফুটবল তার নেতৃত্বের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশা করে না।
সে কারণেই আমরা এই অবস্থান নিয়েছি: হেলাফেলা করে নয় এবং একা নয়, বরং একসঙ্গে এবং যে খেলাকে আমরা সেবা করি তার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে। ফুটবলের শক্তি সবসময় তার ঐক্যে। আমরা আজ সেই ঐক্যকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি— এমন এক নেতৃত্বের জন্য যা ফুটবলকে সেবা করবে, শাসন করার চেষ্টা করবে না।
চিঠিটিতে স্বাক্ষর করেছেন সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা (এএফসি সভাপতি), ভিক্টর মন্তালিয়ানি (কনকাকাফ সভাপতি), আলেকজান্ডার সেফেরিন (উয়েফা সভাপতি), দাতুক সেরি উইন্ডসর জন (এএফসি সাধারণ সম্পাদক), ফিলিপ মজিও (কনকাকাফ সাধারণ সম্পাদক) এবং থিওডোর থিওডোরিডিস (উয়েফা সাধারণ সম্পাদক)।




