বিদায়লগ্ন
ভালোবাসায় সিক্ত মেসি, চরম বিতর্কে রোনালদো

দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলকে আচ্ছন্ন করে রাখা দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্তিম লগ্ন এসে পৌঁছেছে প্রায় একই সাথে। তবে তাদের এই বিদায়লগ্নের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। একদিকে মেসি যখন স্তাদিও মনুমেন্তালে এক আবেগঘন ও রাজকীয় বিদায়ের অপেক্ষায়, অন্যদিকে পর্তুগাল দলে রোনালদোর থাকা-না থাকা নিয়ে তৈরি করেছে তীব্র নাটকীয়তা ও বিতর্ক।
বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরে বুয়েনস এইরেসে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলতে নামছেন লিওনেল মেসি। ম্যাচটি কেবল একটি ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই তারকার প্রতি গোটা বিশ্বের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক বিশাল উৎসব। লাতিন আমেরিকা তো বটেই, গোটা বিশ্ব অধীর অপেক্ষায় আছে ফুটবল জাদুকরকে রাজকীয় বিদায় দিতে।
এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র ইউরোপে। উয়েফা নেশনস লিগে নরওয়ের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ না পাওয়ায় কোচ জর্জ জেসুসের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন রোনালদো। ম্যাচ শেষে কোচিং স্টাফের ব্যাখ্যার প্রতিবাদ জানিয়ে হুট করেই জাতীয় দলের ট্রেনিং ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। যদিও তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি, তবুও তার এই আকস্মিক পদত্যাগ এবং ইনস্টাগ্রামে দেওয়া রহস্যজনক পোস্ট পরিস্থিতিকে বেশ ঘোলাটে করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ফার্নান্দো সান্তোস বা রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে রোনালদোকে যেকোনো মূল্যে একাদশে রাখার প্রবণতা ছিল। তবে বর্তমান কোচ জর্জ জেসুস সেই ধারা ভেঙে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে—পারফরম্যান্সই শেষ কথা, নাম বা খ্যাতি নয়। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে কোচ কৌশলগত কারণে তাকে বেঞ্চে রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও রোনালদোর অতি-প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে কিছুটা হলেও মলিন করে দিয়েছে।
এর আগে শেষ দুটি বিশ্বকাপে দুই তারকার পারফরম্যান্সও তাদের বর্তমান ব্যবধানের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়। মেসি যেখানে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন এবং নিজের পারফরম্যান্সের চূড়ায় থেকে বিদায় নিচ্ছেন, সেখানে রোনালদো বিগত টুর্নামেন্টগুলোতে নকআউট পর্বে ছিটকে যাওয়ার পাশাপাশি দলে তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন।
অবশ্য গতকাল রাতে নরওয়েকে ২–১ গোলে হারিয়ে উয়েফা নেশনস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতের পর জর্জ জেসুস বলেছেন, রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের দরজা খোলা। তবু সবমিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসের এই দুই দিকপালের বিদায় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। নিয়মতান্ত্রিক ও পরিপক্ক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মেসি যেখানে তার দেশকে উৎসর্গ করেছেন এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য, সেখানে রোনালদোর বিদায়লগ্নটি চিহ্নিত হয়ে রইল কিছুটা অহংকার, জেদ আর বিতর্কের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে।





