শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা

শীত ডাকাতের মতো হানা দিলে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে
আশ্বিন ফুরিয়ে এলো। হেমন্তকাল খুব কাছে। গ্রামে ডোবা আর পুকুরের পানিতে এখন টান ধরবে, সেখানে মরা পানির ঘ্রাণ ভেদ করে ভেসে উঠবে গত বর্ষায় ভেঙে পড়া গাছের ডাল, পুরনো টিনের চাল, কারো ফেলে যাওয়া বড়শি।
আরও কিছুদিন আগে থেকে গ্রামগুলো ছোট করে চিঠি লিখতে শুরু করেছে শহরকে। মফস্বলের চিঠিও এসেছে শহরের ডাকবাক্সে। সেসব চিঠি থেকে জানা গেছে, আজকাল ভোরবেলা মাঠের ওপর কুয়াশার চাদর ছড়িয়ে পড়ছে। বিকেলে অদ্ভুত এক উদাসী হলুদ আলো মশারির মতো নেমে আসে চারপাশে। পায়ের তলায় ভেজা ঘাসের স্পর্শ এখনো পাওয়া না গেলেও কোনো বাড়ির দরজার পাশে সারা রাত একা দাঁড়িয়ে থাকে সাইকেল হালকা হিম মাথায় নিয়ে। কিন্তু নগরে এই ছবির ছিটেফোঁটা কোথাও নেই। এখানে ভোর আসে তাড়াহুড়ো করে নিজেকে তীব্র তাপের কাছে সমর্পণ করতে। আশ্বিন মাসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে রাত্রিগুলোকে মনে হয়, জীবনানন্দের কবিতায় লিবিয়ার অলৌকিক জঙ্গল। পোকা-মাকড়ের এক মনে জেগে থাকা, গাড়ির টায়ারের কর্কশ শব্দের দাগ লেগে থাকা নিকষ কালো পিচের রাস্তা গরমে হাঁসফাঁস করে। ঘড়ির কাটা গভীর রাত ভেদ করে আরও এগিয়ে গেলে কোনো বৃক্ষের শাখার অজানা অবস্থানে বসে প্যাঁচা ডাকে। নৈশকালের পাহারাওয়ালার বাঁশি জানান দেয়, আর কয়েকদিন পরেই তাদের সঙ্গে চাঁদের পাশে জেগে থাকবে মৃগশিরা নক্ষত্রও।
এই শহরে শিউলি ফুল ফোটেনি কোথাও। নিজের পাড়ায়ও খুঁজে দেখেছি, কোথাও দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একা গাছটার নিচে ছড়িয়ে পড়ে নেই ভোরের নিজস্ব নির্জনতা মাখা সাদা-কমলা ফুলের একলা উৎসব। তবে শহরের অনেকটা উঁচু দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা যায় দূরের ফাঁকা মাঠে ফুটে ওঠা কাশফুল বৃদ্ধ ঢুলির মতো মাথা দোলাচ্ছে মৃদু বাতাসে।
বেলা বাড়লেই এখন আকাশে রোদ সাদা মেঘের নখ দাঁতে কাটে প্রত্যেকদিন। আগারগাঁওয়ের আবহাওয়া বাড়ির ছাদে পাতা লোহার মোরগটা জানিয়ে দেয় হাওয়া কোনদিকে। হেমন্তে এবার গরম ধীরে ধীরে কমে আসার আভাস মিলছে তার বার্তায়। শীত আসবে ধীর পায়ে। ততদিন রোদের ফোয়ারা ঝরতে থাকবে চারপাশে, সঙ্গে থাকবে গরমের অস্বস্তি। মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ ফুরিয়ে আসারও খবর দিচ্ছে আবহাওয়া দপ্তর।
শীতের কথা ভাবলে শীতনিদ্রার কথা মনে পড়ে। মার্কিন লেখক ওয়াশিংটন আর্ভির উপন্যাসের চরিত্র রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মতো শতবর্ষ ঘুমিয়ে থাকার ইচ্ছে জাগে হয়ত কারো কারো মনে। কবি ভাস্কর চক্রবর্তী শীতের তিন মাস ঘুমিয়ে থেকে হাইবারনেশনে যেতে চেয়েছিলেন। শীতকাল কি সবকিছু থেকে মুক্তি দেয় আমাদের? এই নগরে মাথা নিচু করে, প্রত্যেকদিনের রোজনামচা লিখতে লিখতে, রক্তাক্ত হতে হতে যখন জীবনযুদ্ধে বিরতি চায় তখন শীতকাল তার জন্য শুশ্রুষা ডেকে আনে? শীতে হাইবারনেশনের মতো আত্মহত্যাপ্রবণ চেতনার পাশাপাশি তো উৎসবও থাকে। দুর্গাপূজার ছুটি মেলে আচমকা। একদল মানুষ হৈ হৈ করতে করতে করতে নগরের জটিলতা ভেদ করে সবুজ প্রান্তরের কাছে চলে যায়, অরণ্যের কাছে যায়। পুরো শীতকাল আসলে ঘুমিয়ে থাকার জন্য নয় তাদের কাছে। কিন্তু এই শহরে যদি আর কখনো শীত না আসে? যদি কুয়াশার অব্যর্থ জাল আমাদের ঢেকে না ফেলে কোনো একদিন তাহলে কি কোনো কবি সুপর্ণার কাছে জানতে চাইবে না, শীতকাল কবে আসবে?
উত্তরে অনেকদূর পথ চলে যাওয়ার পর তুষারশুভ্র হিমালয় দাঁড়িয়ে আছে। তারপরেও আমরা রয়ে গেলাম গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হয়ে। আড়াই হাজার বছর আগে বীর আলেকজান্ডারকে ধরাশায়ী করার অন্যতম এক নায়ক ছিল এই গরম আবহাওয়া। সেই পরিস্থিতি থেকে আমাদের উত্তরণের পথ দিনে দিনে আরও হারিয়ে যাচ্ছে। শীতের জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো অবলম্বন নেই হাতে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান’। সেখানে লিখছেন,
কতকালের পুরনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছে অই
হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানগুলি
একটি চিঠি হতে অন্য চিঠির দূরত্ব বেড়েছে কেবল
একটি গাছ হতে অন্য গাছের দূরত্ব বাড়তে দেখিনি আমি।
একটি চিঠি থেকে অন্য চিঠির দূরত্ব বেড়ে যায় বলেই কি শীতকাল আসতে দেরি হয়ে যায় প্রতিবার, সুপর্ণার কাছেও এই প্রশ্নের কোনো উত্তরও থাকে না? গাছগুলো অনেক বছর একই দূরত্বে থেকে গেলেও শীতের আগমন বার্তা ক্রমেই দূরে সরে যেতে থাকে আমাদের কাছ থেকে। এখন শীতের আগমন ভীষণ এলেবেলে। কোন বছর শীতের গল্প হয়ে উঠবে ভীষণ উত্তেজনাকর অথবা ম্রিয়মান তা নিয়ে আবহাওয়া দপ্তরের কাছে নাগরিকদের প্রশ্নের শেষ নেই। গণমাধ্যমগুলোতে শুধু মাঝে মাঝে জানা যায়, গ্রামেগঞ্জে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে। এবার ফুলকপির চাষ ভালো হবে। বাঁশের মাচার ওপর শিশির মেখে শুয়ে থাকবে চালকুমড়া।
অনেক বছর আগে তবুও তো নিয়ম করে শীতকাল আসত। শ্বাস টানলে বাতাসে পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ টের পাওয়া যেত। হেমন্তের শুরুতেই সন্ধ্যাগুলো কেমন ঘোর লাগা হয়ে যেত কুয়াশার হালকা আস্তরণ পড়ে। এখন কে যে ঠিক কখন টের পায় হেমন্তের আগমন এই নগরে তার ঠিক নেই। হেমন্তের আগমনই যেখানে টের পাওয়া যায় না সেখানে শীত তো পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়া পলাতক আসামি।
শীত ডাকাতের মতো হানা দিলে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। জীবনসংগ্রামে জর্জরিত মানুষদের জীবনে শীত নিয়ে রোম্যান্টিক গল্পের কোনো স্থান নেই জানি। ফুটপাতে ভ্যানগুলোতে কম পয়সায় শীতবস্ত্র আর রাতের খোলা আকাশের নিচে মাথার ওপর পলিথিন টানিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত হবে মহাকালের নিয়মে। তবুও হেমন্তকালের আগমন বার্তায় বাঙালির মনে শীতকাল ভালোবাসার চিরন্তন ছবিটাই ফুটে ওঠে। উৎসবের ছোঁয়া লাগে সেই ছবিতে। দুর্গাপূজা আসার আগে অথবা পরে পাল্টে যেতে থাকে সবজির বাজার। দাম বিপদ সংকেত ছড়ালেও সতেজ শাক অথবা শিম-কপি হাসিমুখে আবাহন জানায়। কারো কারো মনে স্মৃতির পর্দা দুলে ওঠে শীতে তৈরি পিঠার কথা ভেবে। কবিরা তাই হয়ত প্রশ্ন করে— শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?





