কৃষকের জন্য টাকা নেই বোয়িং কেনার সামর্থ্য আছে!

বাংলাদেশের কৃষি দ্বিমুখী সংকটের মুখে। একদিকে জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে; অন্যদিকে ক্রমাগত কমছে মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ। রংপুরে গত পাঁচ বছরে অন্তত দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার ঘটনা এই বৃহত্তর সংকটেরই একটি উদাহরণ। শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত একটি অঞ্চলে তিন ও চার ফসলি জমি আবাসন, শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দখলে চলে যাওয়া উদ্বেগজনক। তবে সমস্যাটিকে শুধু রংপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নগরায়ণ, শিল্পায়ন, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা ও ভূমিক্ষয়ের কারণে কৃষিজমি কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬১-৬২ সালে মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ২০ বিঘা। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ৩৪ বিঘায়। অর্থাৎ কয়েক দশকে মাথাপিছু কৃষিজমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে সেই অল্প জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আগে যেসব জমিতে বছরে তিনবার ফসল হতো, সেখানে কোথাও দুবার হচ্ছে; দুই ফসলি জমির কোনো কোনোটি এক ফসলি হয়ে যাচ্ছে। এমনকি কিছু জমি একেবারেই অনাবাদি থাকছে। এ প্রবণতা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। প্রাকৃতিক কারণে জমি হারানোর বিষয়টি একরকম; কিন্তু উৎপাদন অলাভজনক হয়ে পড়ায় কৃষক যখন নিজের জমিতে চাষ করতে আগ্রহ হারান, তখন সেটি কৃষি অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ।
কৃষকের এই অনাগ্রহের পেছনে উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেড়েছে; কিন্তু কৃষিপণ্যের দাম একই হারে বাড়েনি। গ্রাম থেকে বহু মানুষ শহরে এসে নিরাপত্তাকর্মী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে কৃষিতে শ্রমিকের সরবরাহ কমছে এবং শ্রমের খরচ বাড়ছে। অনেকের জন্য উৎপাদন ব্যয় তুলে আনাই কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে। ফলে কৃষক এক জমিতে তিনবারের পরিবর্তে দুবার, দুবারের পরিবর্তে একবার চাষ করছেন; কেউ কেউ জমি অনাবাদি রাখছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার, বীজ, কীটনাশক, জ্বালানি ও সেচের ব্যয়। বাংলাদেশের বোরো ধান উৎপাদন অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। দেশের খাদ্য উৎপাদনের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বোরো ধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; কিন্তু এই উৎপাদনব্যবস্থা জ্বালানি ও পানির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেচে ব্যয় হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে আরও গভীর থেকে পানি তুলতে হয়, বাড়ে জ্বালানি খরচ। অর্থাৎ একই পরিমাণ ধান উৎপাদন করতে কৃষককে ক্রমেই বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ ব্যবস্থা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত— দুদিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ।
কৃষকের আরেকটি বড় সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তি। শুধু কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নয়, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি যেকোনো ক্ষেত্রেই সেবাপ্রাপ্তি সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন করে রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে যেতে হয় বেসরকারি হাসপাতালে, সেখানে খরচ বেশি। সরকারি স্কুলে সন্তানকে না পাঠিয়ে অপেক্ষকৃত সব সক্ষম মানুষ তাদের সন্তানদের পাঠান মাদ্রাসায়। একইভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না। জটিল প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক হয়রানি এবং নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা তাদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে অনেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কিংবা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ (দাদন) নেন। কোথাও কোথাও আগাম ঋণের বিনিময়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কমে এবং ঋণের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়। কৃষি কার্ড বা সহায়তা কর্মসূচি চালু করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না; কৃষক বাস্তবে কত সহজে ঋণ, সার, বীজ, জ্বালানি ও সেচসুবিধা পাচ্ছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে সরকারের নীতিগত দায়ও রয়েছে। বাংলাদেশে কৃষিজমি ব্যবহারের একটি কার্যকর ও সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। কৃষিজমির মাঝখানে বিচ্ছিন্নভাবে বসতবাড়ি, দোকান বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে শুধু সে জমিটুকুই নষ্ট হয় না; সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে আশপাশের জমিও কৃষিকাজের বাইরে চলে যেতে পারে। কোথায় আবাসন হবে, কোথায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং কোন জমিকৃষির জন্য সংরক্ষিত থাকবে— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। জমির মালিকানা থাকলেই যেকোনো জমি যেকোনো কাজে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত কি না, সে প্রশ্নও নীতিগতভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কৃষিজমি রক্ষার দায় শুধু কৃষকের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। কৃষি অলাভজনক হয়ে পড়লে জমির মালিক বিকল্প আয়ের পথ খুঁজবেন— এটিই স্বাভাবিক। তাই জমি রক্ষার পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক করাও অপরিহার্য।
এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারের অনিশ্চয়তা। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, সার উৎপাদন ও পরিবহনে বিঘ্ন এবং জলবায়ুর বিরূপ আচরণ খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আবহাওয়া ও কৃষি উৎপাদনের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মিল থাকায় একটি অঞ্চলের উৎপাদন বিপর্যয় অন্য দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এল নিনোর মতো জলবায়ুগত ঘটনা বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে দিলে এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তবে সম্ভাব্য সংকটের মাত্রা নির্ভর করবে উৎপাদন, মজুদ, বাণিজ্য ও নীতিগত প্রতিক্রিয়ার ওপর।
সরকার বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় ব্যয়ের উদ্যোগ নিতে পারছে। উড়োজাহাজ কেনার নিজস্ব বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যুক্তি থাকতে পারে; কিন্তু দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কোটি মানুষের জীবিকার ভিত্তি কৃষিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে না পারলে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, পরিবেশগত ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের হাতে বৈশ্বিক সংঘাত বা জলবায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু নিজস্ব কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। সামনে কৃষি মৌসুমের প্রয়োজনীয় সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থা আগেভাগে নিশ্চিত করতে হবে। কেন জমি অনাবাদি থাকছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিঋণ ও উপকরণ সহায়তা দিতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে এককভাবে কৃষিযন্ত্র কেনা কঠিন হলে সমবায়ভিত্তিক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য ও সংরক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। আলু-পেঁয়াজের মতো ফসল উৎপাদনের পর বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণে দুর্বলতার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যতে তারা উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
এখানেই সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একদিকে কৃষক উৎপাদন ব্যয় সামলাতে পারছেন না, খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে; অন্যদিকে সরকার বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মতো বড় ব্যয়ের উদ্যোগ নিতে পারছে। উড়োজাহাজ কেনার নিজস্ব বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কোটি মানুষের জীবিকার ভিত্তি কৃষিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে না পারলে ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সরকারের সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতটি কার্ড বিতরণ করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। কৃষক প্রয়োজনীয় উপকরণ পাচ্ছেন কি না, উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন কি না এবং যুক্তিসংগত মুনাফা থাকছে কি না, সেটিই আসল পরীক্ষা। কৃষিঋণপ্রাপ্তির জটিলতা কমিয়ে প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানো এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। বোয়িং কেনার সামর্থ্য থাকলেও কৃষকের উৎপাদন টিকিয়ে রাখার বিনিয়োগে ঘাটতি থাকলে সেটি নীতির বৈপরীত্য। আন্তর্জাতিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের কৃষক, কৃষিজমি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করা।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)




