সিরাতুর রাসূল
প্রতিবেশীর প্রতি মহানবী (সা.)-এর অনন্য মানবিকতা

প্রতীকী ছবি
মানুষের চরিত্রের সৌন্দর্য শুধু ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেই প্রকাশ পায় না; বরং চারপাশের মানুষের সঙ্গে আচরণেও তার ঈমান ও নৈতিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। তাই ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.) নিজ জীবনে প্রতিবেশীর প্রতি যে মমতা, সহমর্মিতা, সৌজন্য ও দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা মানবিকতার এক অনন্য আদর্শ।
প্রতিবেশীর মর্যাদা মহানবী (সা.)-এর কাছে কতটা গভীর ছিল, তা তাঁর একটি হাদিস থেকেই স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন,
عَنْ عَائِشَةَ ـ رضى الله عنها ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَا زَالَ يُوصِينِي جِبْرِيلُ بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ
‘আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (সা.) বলেছেন, আমাকে জিবরীল (আ.) সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করতে থাকেন। এমনকি, আমার ধারণা হয়, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৪)
প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে জিবরিল (আ.)-এর বারবার অসিয়ত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এমন অনুভূতি প্রমাণ করে, ইসলামে প্রতিবেশীর অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেশীর প্রতি মহানবী (সা.)-এর আচরণ ছিল অত্যন্ত বাস্তব ও হৃদয়গ্রাহী। তিনি শুধু নৈতিকতার সাধারণ শিক্ষা দেননি, বরং প্রতিদিনের জীবনযাপনের ছোট ছোট কাজের মধ্যেও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার পথ দেখিয়েছেন। আবু জর (রা.)-কে তিনি বলেন,
يَا أَبَا ذَرٍّ، إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً فَأَكْثِرْ مَاءَهَا وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ
‘হে আবু জর! তুমি যখন ঝোল রান্না করবে, তাতে পানি বাড়িয়ে দাও এবং তোমার প্রতিবেশীদের খোঁজ নাও।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬২৫)
কত সামান্য একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে কত বড় মানবিক শিক্ষা! নিজের ঘরে খাবার রান্না হলে পাশের ঘরের মানুষের কথাও মনে রাখতে হবে। সামর্থ্য কম হলেও ভালোবাসা ও অংশীদারত্বের দরজা বন্ধ করা যাবে না।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণকে মহানবী (সা.) ঈমানের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৭)
অর্থাৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ নিছক সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের যে সৌন্দর্য, এই হাদিসে তার গভীর প্রকাশ ঘটেছে।
অন্যদিকে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া সম্পর্কে মহানবী (সা.) কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
‘যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৬)
প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ও স্বস্তিকে এভাবে জান্নাতের সঙ্গে যুক্ত করা ইসলামের সামাজিক নীতির গভীরতা প্রকাশ করে। একজন মানুষ ইবাদত করেও যদি তার আচরণে প্রতিবেশী কষ্ট পায়, আতঙ্কিত হয় বা তার অনিষ্টের আশঙ্কায় থাকে, তবে তার নৈতিক জীবনে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়।
মহানবী (সা.)-এর প্রতিবেশী-আচরণের সৌন্দর্য ছিল এখানেই যে, তিনি মানুষের অধিকারকে কেবল বক্তৃতার বিষয় বানাননি; বরং তা নিজের জীবনে বাস্তব করে দেখিয়েছেন। প্রতিবেশীর প্রয়োজনের প্রতি নজর রাখা, তাকে খাবারে অংশীদার করা, ভালো ব্যবহার করা এবং নিজের দ্বারা কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া তাঁর শিক্ষা। তাঁর দৃষ্টিতে প্রতিবেশী শুধু পাশের বাড়ির একজন মানুষ নয়; বরং তার সুখ-দুঃখের সঙ্গে নিজের মানবিক দায়িত্বও জড়িয়ে আছে।
আজকের সমাজে মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেও অনেক সময় প্রতিবেশীর খোঁজ রাখে না। বহুতল ভবনের একই তলায় থেকেও পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটি অসুস্থ কি না, অভুক্ত কি না কিংবা কোনো বিপদে আছে কি না, তা আমরা জানি না। এমন বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর প্রতিবেশী-নীতি আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। নিজের সুখের পাশাপাশি অন্যের স্বস্তির কথা ভাবা, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং নিজের আচরণে কাউকে কষ্ট না দেওয়া, এগুলোই নববী আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ।
প্রতিবেশীর সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর অভূতপূর্ব আচরণ শুধু একটি সুন্দর সামাজিক রীতির শিক্ষা নয়; এটি একটি মানবিক, সহমর্মী ও ঈমানদার সমাজ নির্মাণের ভিত্তি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, বড় মানবিকতা অনেক সময় বড় কাজের মধ্যে নয়, বরং এক বাটি খাবার ভাগ করে নেওয়া, একজন অসহায় মানুষের খোঁজ নেওয়া কিংবা নিজের অনিষ্ট থেকে একজন প্রতিবেশীকে নিরাপদ রাখার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






