বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আচরণের নববী রীতি

প্রতীকী ছবি
বিরোধিতা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র, কোথাও মতের অমিল নেই এমন জীবন কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু বিরোধিতা যখন শত্রুতায় রূপ নেয়; তখন মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরীক্ষা শুরু হয়। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণেই প্রকাশ পায় একজন মানুষের ন্যায়বোধ, সংযম ও নৈতিকতার গভীরতা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এ ক্ষেত্রে মানবতার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাঁর সাহাবিদের ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে, তাঁকে মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়ে তিনি ন্যায় ও মানবিকতার সীমা অতিক্রম করেননি।
মক্কায় নবুয়তের প্রথম দিক থেকেই মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীরা কঠিন নির্যাতনের শিকার হন। তাঁকে উপহাস করা হয়েছে, পথের মধ্যে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, সাহাবিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেননি। বরং তাঁর দাওয়াতের মূলনীতি ছিল সত্য ও উত্তম পদ্ধতিতে মানুষকে আহ্বান করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘মন্দকে এমন পদ্ধতিতে প্রতিহত করো, যা উত্তম; তখন দেখবে, যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪)। এই আয়াত শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, বিরোধ মোকাবিলার একটি মৌলিক নীতিও নির্দেশ করে।
তায়েফের ঘটনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্তগুলোর একটি। মক্কার বাইরে দাওয়াতের আশায় তিনি তায়েফে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানকার নেতারা তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে উল্টো তাঁকে উপহাস ও নির্যাতন করেন। শহরের শিশু ও লোকজনকে নবীজির পেছনে লেলিয়ে দিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত করা হয়। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে তাঁকে প্রস্তাব দেন, চাইলে দুই পাহাড়ের মাঝখানে তাদের পিষে দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বরং আশা প্রকাশ করেন, তাদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ জন্ম নেবে যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে (মুসলিম, হাদিস : ১৭৯৫)। প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া তাঁর বিরোধী পক্ষের প্রতি আচরণের অসাধারণ শিক্ষা।
উহুদের যুদ্ধেও নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের ওপর ভয়াবহ আঘাত আসে। তাঁর চেহারা আহত হয়, দাঁত ভেঙে যায় আর তিনি রক্তাক্ত হন। এমন পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের অনুসারীদের প্রতিহিংসার সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধ করেননি।
হুদাইবিয়ার সন্ধিও বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শিতার বড় দৃষ্টান্ত। কুরাইশ নেতারা তাঁকে ও সাহাবিদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দিয়েছিল। সন্ধির কিছু শর্ত অনেক সাহাবির কাছে কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু নবীজি (সা.) বৃহত্তর শান্তি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বিবেচনা করে চুক্তিতে সম্মত হন। পরবর্তীতে কোরআন এই সন্ধিকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করে (সুরা ফাতহ, আয়াত : ১)। বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সব সময় সংঘাত নয়, প্রয়োজন হলে ন্যায়সঙ্গত সমঝোতাও যে নেতৃত্বের অংশ, হুদাইবিয়া তার অনন্য দৃষ্টান্ত।
এরপর আসে মক্কা বিজয়ের দিন। যে নগরীর মানুষ বছরের পর বছর নির্যাতন চালিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই নগরী তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। হাতে তখন প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা। কিন্তু বিজয়ী মুহাম্মদ (সা.) প্রতিহিংসার ভাষা বেছে না নিয়ে সাধারণ নিরাপত্তার ঘোষণা দেন এবং বহু প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দেন। মক্কা বিজয়ের ঘটনাবলি বর্ণনাকারী ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে তাঁর সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি বিস্তারিত এসেছে (ইবন হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ৪/৪৮-৫২)। ক্ষমতা হাতে থাকার পরও প্রতিশোধকে লক্ষ্য না বানানো তাঁর নেতৃত্বের নৈতিক উচ্চতাকে প্রকাশ করে।
তবে নবীজি (সা.)-এর ক্ষমাশীলতার অর্থ এই নয় যে তিনি অন্যায় ও অপরাধকে নীতিহীনভাবে মেনে নিতেন। তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন, চুক্তি রক্ষা করেছেন এবং অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিয়েছেন। পবিত্র কোরআনও নির্দেশ দিয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮)। অর্থাৎ প্রতিপক্ষের প্রতি ন্যায় করা তখনই সত্যিকারের নৈতিকতা, যখন তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেও ন্যায়ের মানদণ্ড বদলে যায় না।
আজকের পৃথিবীতে মতভেদ খুব দ্রুত শত্রুতায় পরিণত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতের অমিল থেকে অপমান ও চরিত্রহনন শুরু হচ্ছে, এমনকি ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্যও অনেক সময় ঘৃণার কারণ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় নবীজি (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, বিরোধী হওয়া মানেই অমানবিক হয়ে যাওয়া নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা যায়, অথচ ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত থাকা যায়; নিজের অধিকার রক্ষা করা যায়, অথচ অন্যের অধিকার অস্বীকার না করেও।
মহানবী (সা.)-এর বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আচরণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে- প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও সংযম; দুর্বলতা নয়, ক্ষমতার মধ্যেও আত্মনিয়ন্ত্রণ; ঘৃণা নয়, মানুষের সংশোধনের সম্ভাবনার প্রতি আস্থা।
নবী জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, সত্যিকারের বিজয় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং এমনভাবে বিজয়ী হওয়ার মধ্যে, যাতে প্রতিপক্ষও একদিন আপনার চরিত্রের মহত্ত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






