কোরআনের বাণী
সৃষ্টি ও পুনরুত্থান নিয়ে কোরআনের বিস্ময়কর ঘোষণা
- কিয়ামতের পুনরুত্থান কেন আল্লাহর জন্য কঠিন নয়

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ২৮
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
مَا خَلۡقُكُمۡ وَ لَا بَعۡثُكُمۡ اِلَّا كَنَفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِیۡعٌۢ بَصِیۡرٌ ﴿۲۸﴾
২৮. তোমাদের সবার সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষের সামনে তাঁর অসীম ক্ষমতার এক গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। মানুষের দৃষ্টিতে কোটি কোটি মানুষের সৃষ্টি, তাদের জীবনদান, মৃত্যু এবং পুনরায় কিয়ামতের দিন জীবিত করে তোলা এক বিশাল ও অকল্পনীয় ব্যাপার। মানুষ যখন নিজের সীমাবদ্ধ শক্তির সঙ্গে বিষয়টিকে তুলনা করে, তখন পুনরুত্থানকে কঠিন মনে হয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন, তাঁর ক্ষমতার সামনে অসংখ্য মানুষ আর একজন মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
মানুষের জন্য একটি ঘর নির্মাণ আর একটি শহর নির্মাণের মধ্যে যেমন বিশাল পার্থক্য রয়েছে, একজন মানুষকে পরিচালনা করা আর কোটি মানুষকে পরিচালনা করা যেমন অসম্ভবের কাছাকাছি; আল্লাহর জন্য বিষয়টি তেমন নয়। কারণ মানুষের শক্তি সীমিত, কিন্তু আল্লাহর শক্তি অসীম। তিনি যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।
এই আয়াত মূলত কিয়ামত ও পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের জবাব। মক্কার মুশরিকরা ভাবত, মানুষের হাড় গুঁড়া হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর আবার কীভাবে তাকে জীবিত করা সম্ভব? তাদের এই সন্দেহ দূর করতেই আল্লাহ বলছেন, তোমাদের সবাইকে পুনরুত্থিত করা তাঁর জন্য একজন মানুষকে সৃষ্টি করার মতোই সহজ।
তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, আল্লাহর আদেশ ও ক্ষমতা এমন যে, সমস্ত সৃষ্টিকে একসঙ্গে জীবিত করা আর একজনকে জীবিত করা তাঁর কাছে সমান। কারণ তিনি সময়, পরিশ্রম কিংবা উপকরণের মুখাপেক্ষী নন। মানুষের কাজ ধাপে ধাপে হয়, কিন্তু আল্লাহর কাজ তাৎক্ষণিক।
এই আয়াত মানুষের অহংকারও ভেঙে দেয়। মানুষ কখনো নিজের সংখ্যা, শক্তি, সভ্যতা বা প্রযুক্তি নিয়ে গর্ব করে। অথচ আল্লাহর কাছে সমগ্র মানবজাতি একটি প্রাণের মতোই নগণ্য। তিনি সবাইকে দেখেন, সবার কথা শোনেন, সবার অন্তরের গোপন চিন্তাও জানেন। তাই আয়াতের শেষে বলা হয়েছে—‘নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা’।
এখানে ‘সর্বশ্রোতা’ শব্দটি মানুষকে সতর্ক করে যে, কোনো উচ্চারিত শব্দ, অভিযোগ, অস্বীকার বা বিদ্রূপ আল্লাহর অগোচরে নয়। আর ‘সম্যক দ্রষ্টা’ বোঝায়, মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সব আমলই তাঁর দৃষ্টির মধ্যে রয়েছে। কিয়ামতের দিন তাই কেউ পালাতে পারবে না, অস্বীকারও করতে পারবে না।
এই আয়াত আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করে। এটি শেখায়, মৃত্যু শেষ নয়; বরং এটি নতুন জীবনের সূচনা। যে আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতেও পূর্ণ ক্ষমতাবান। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে এই যুক্তি এসেছে। যেমন আল্লাহ বলেন— ‘যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পুনরায় সৃষ্টি করবেন’। (সুরা আর-রূম, আয়াত : ২৭)
অতএব, এই আয়াত শুধু আল্লাহর কুদরতের ঘোষণা নয়; বরং এটি মানুষকে আখিরাতমুখী হওয়ার আহ্বান। পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পুনরুত্থানের পরের জীবন অনন্ত। তাই জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা উপলব্ধি করে তাঁর সামনে আত্মসমর্পণ করে এবং কিয়ামতের দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।




