কোরআনের বাণী
আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের সামর্থ্য অর্থহীন

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ৩১
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
اَلَمۡ تَرَ اَنَّ الۡفُلۡكَ تَجۡرِیۡ فِی الۡبَحۡرِ بِنِعۡمَتِ اللّٰهِ لِیُرِیَكُمۡ مِّنۡ اٰیٰتِهٖ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّكُلِّ صَبَّارٍ شَكُوۡرٍ ﴿۳۱﴾
(৩১) তুমি কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহর অনুগ্রহে জলযানগুলি সমুদ্রে বিচরণ করে তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখাবার জন্য? অবশ্যই এতে সব ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে তাঁর কুদরত, রহমত ও পরিচালনাশক্তির এক বিস্ময়কর নিদর্শন তুলে ধরেছেন। আয়াতের ভাষা সংক্ষিপ্ত হলেও এর ভেতরে রয়েছে গভীর চিন্তা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং মানবসভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আয়াতে প্রথমেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে সমুদ্রযাত্রার দিকে। মানুষের দৃষ্টিতে জাহাজ শুধু কাঠ, লোহা বা আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত একটি বাহন। কিন্তু পবিত্র কোরআন মানুষকে বাহ্যিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ভাবতে শেখায়। টনকে টন পণ্য বুকে নিয়ে সমুদ্রের ওপর বিশাল জাহাজ কীভাবে ডুবে না যেয়ে ভেসে থাকে? কে পানিকে এমন বৈশিষ্ট্য দিয়েছে যে তা জাহাজকে বহন করে ভাসিয়ে রাখে? কে বাতাস সৃষ্টি করেছেন, যিনি ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করেন, যিনি মানুষের বুদ্ধিকে এমন সক্ষমতা দিয়েছেন যে, সে নৌযান নির্মাণ করতে পারে? পবিত্র কোরআন বলছে, এসব শুধু প্রযুক্তির ফল নয়; বরং “بِنِعْمَتِ اللَّهِ” অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহের ফল।
এখানে ‘অনুগ্রহ’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ নিজের শক্তি নিয়ে গর্ব করে, কিন্তু বাস্তবে মানুষ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর তৈরি নিয়মের ওপর নির্ভরশীল। সমুদ্র যদি উত্তাল হয়ে ওঠে, বাতাস যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অথবা পানির বৈশিষ্ট্যে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, তবে মানুষের সমস্ত প্রযুক্তি মুহূর্তেই অসহায় হয়ে পড়তে পারে। তাই জাহাজ চলা শুধু বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহর রহমত ও পরিচালনার একটি প্রকাশ।
আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যাতে তিনি তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শনাবলী দেখান’। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি শুধু ব্যবহার করার বস্তু নয়, বরং চিন্তা করার উপকরণ। সমুদ্রের বিশালতা, ঢেউয়ের ভয়ংকর শক্তি, তার মাঝখানে একটি ছোট্ট জাহাজের নিরাপদ চলাচল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এই বিশ্বজগৎ একজন মহান স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। যারা গভীরভাবে চিন্তা করে, তারা প্রতিটি ঘটনার মধ্যে আল্লাহর পরিচয় খুঁজে পায়।
তারপর আল্লাহ বলেছেন, ‘এতে নিদর্শন রয়েছে সব ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য’। এখানে দুটি গুণ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা।
‘ধৈর্যশীল’ বলা হয়েছে এজন্য যে, সত্য উপলব্ধি করতে হলে মানুষের অন্তরে স্থিরতা ও সহনশীলতা থাকতে হয়। সমুদ্রযাত্রা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি জীবনও নানা পরীক্ষায় পূর্ণ। যে ব্যক্তি বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, সে আল্লাহর কুদরতকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
আর ‘কৃতজ্ঞ’ বলা হয়েছে এজন্য যে, নিয়ামতকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা সবার থাকে না। কেউ জাহাজ দেখে শুধু ব্যবসা ও প্রযুক্তি দেখে, আবার কেউ সেখানে আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ দেখতে পায়। কৃতজ্ঞ মানুষ প্রতিটি নিয়ামতের পেছনে দাতাকে স্মরণ করে।
বর্তমান যুগে এ আয়াতের তাৎপর্য আরও গভীর। আজ মানুষ আধুনিক জাহাজ, সাবমেরিন, বিমান ও মহাকাশযান তৈরি করেছে। কিন্তু সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগই প্রমাণ করে দেয়, মানুষের ক্ষমতা সীমিত। তাই সভ্যতার অগ্রগতি মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে নয়, বরং আরও বেশি বিনয়ী ও কৃতজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা দেওয়ার কথা।
এই আয়াত মূলত মানুষকে তিনটি শিক্ষা দেয়, এক. পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। দুই. মানুষের সামর্থ্য আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া অর্থহীন। তিন. ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা ছাড়া মানুষ প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।
তাই একজন মুমিন যখন সমুদ্রের বুকে চলমান জাহাজ দেখে, তখন সে শুধু একটি বাহন দেখে না; বরং আল্লাহর মহাশক্তি, করুণা ও পরিচালনার জীবন্ত প্রমাণ প্রত্যক্ষ করে।


