কোরআনের বাণী
আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ২৭
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ لَوۡ اَنَّ مَا فِی الۡاَرۡضِ مِنۡ شَجَرَۃٍ اَقۡلَامٌ وَّ الۡبَحۡرُ یَمُدُّهٗ مِنۡۢ بَعۡدِهٖ سَبۡعَۃُ اَبۡحُرٍ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمٰتُ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَزِیۡزٌ حَكِیۡمٌ ﴿۲۷﴾
২৭. আর যমীনের সব গাছ যদি কলম হয় এবং সাগর, তার পরে আরও সাত সাগর কালি হিসেবে যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ্ মহা পরাক্রমশালী হিকমতওয়ালা।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এই আয়াতটি একটি গভীর অর্থবহ ঘোষণা। এখানে আল্লাহ তাআলা এমন এক চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন, যা মানুষের কল্পনাশক্তিকেও স্তব্ধ করে দেয়।
এই আয়াতে মূলত আল্লাহর জ্ঞান, হিকমত, ক্ষমতা ও বাণীর অসীমতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ পৃথিবীর জ্ঞান নিয়ে যতই গর্ব করুক না কেন, তা আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সামনে এক ফোঁটা পানিরও সমান নয়।
আল্লাহ তাআলা এখানে উদাহরণ দিয়েছেন পৃথিবীর সমস্ত গাছের। কল্পনা করা হোক, পৃথিবীর প্রতিটি বৃক্ষ কেটে কলম বানানো হলো। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর সব সাগরের পানি কালি হয়ে গেল, তারপরও আরও সাতটি সাগর এনে তাতে যুক্ত করা হলো। এত বিপুল কালি ও অসংখ্য কলম দিয়েও যদি আল্লাহর বাণী, জ্ঞান, সৃষ্টি রহস্য, হিকমত ও সিদ্ধান্তসমূহ লিখতে শুরু করা হয়, তবুও তা শেষ হবে না।
এটি কোনো অলংকারমূলক অতিরঞ্জন নয়; বরং মানুষের সীমাবদ্ধতা বোঝানোর জন্য এক বাস্তব সত্যের ভাষাগত উপস্থাপন। কারণ আল্লাহর গুণাবলি অসীম। তার জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে পরিবেষ্টন করে। তিনি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের প্রতিটি কণার খবর রাখেন। একটি শুকনো পাতা কখন ঝরে পড়বে, সমুদ্রের গভীরে কোন প্রাণী কোথায় চলাফেরা করছে, মানুষের অন্তরের গোপন ভাবনা কী; সবই তার জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।
পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদেরকে জ্ঞানের অতি সামান্যই দেওয়া হয়েছে’। (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৮৫) অর্থাৎ মানুষ যত আবিষ্কারই করুক, বিজ্ঞান যত উন্নতই হোক, আল্লাহর জ্ঞানের মহাসমুদ্র থেকে সে কেবল অতি সামান্য অংশই স্পর্শ করতে পারে।
মুফাসসিরগণ বলেন, এখানে ‘আল্লাহর বাণী’ বলতে শুধু কোরআনের আয়াত বোঝানো হয়নি; বরং আল্লাহর আদেশ, সৃষ্টি রহস্য, জ্ঞান, হিকমত এবং তাঁর কুদরতের প্রকাশসমূহও বোঝানো হয়েছে। ইমাম তাবারি (রহ.) উল্লেখ করেন, আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি এত ব্যাপক যে, কোনো সৃষ্টি তা গণনা বা লিপিবদ্ধ করে শেষ করতে পারবে না।
এই আয়াত মানুষের অহংকার ভেঙে দেয়। মানুষ যখন নিজেকে জ্ঞানী মনে করে, প্রযুক্তি ও আবিষ্কারের গর্বে আত্মহারা হয়ে পড়ে, তখন এই আয়াত তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তুমি এখনও অসীম সত্যের প্রান্তেও পৌঁছাতে পারোনি। বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, মহাবিশ্বের রহস্য ততই আরও বিস্তৃত হয়ে সামনে আসছে। একসময় মানুষ ভাবত আকাশে যা দেখা যায়, সেটুকুই মহাবিশ্ব। আজ কোটি কোটি গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েও বিজ্ঞানীরা বলছেন, অজানার পরিমাণ এখনও অসীম।
এ আয়াত মুমিনের অন্তরে বিনয় সৃষ্টি করে। সে বুঝতে শেখে, জ্ঞান আল্লাহর দান। তাই জ্ঞানের প্রকৃত ফল অহংকার নয়, বরং বিনয় ও আল্লাহভীতি। সত্যিকারের জ্ঞানী সেই, যে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে রবের মহত্ত্বের সামনে মাথা নত করে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’।
অর্থাৎ তাঁর ক্ষমতার সামনে কিছুই অসম্ভব নয় এবং তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিখুঁত হিকমতে পূর্ণ। মানুষ অনেক সময় কোনো ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে পারে না, কিন্তু আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা।
এই আয়াত তাই শুধু আল্লাহর অসীম জ্ঞানের ঘোষণা নয়; এটি মানুষের জন্য বিনয়, চিন্তা, গবেষণা ও ঈমানের এক চিরন্তন আহ্বান।


