কোরআনের বাণী
যে দিন পিতা-পুত্র কেউ কারও উপকারে আসবে না
- আখিরাত ভুলে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ৩৩
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّكُمۡ وَ اخۡشَوۡا یَوۡمًا لَّا یَجۡزِیۡ وَالِدٌ عَنۡ وَّلَدِهٖ ۫ وَ لَا مَوۡلُوۡدٌ هُوَ جَازٍ عَنۡ وَّالِدِهٖ شَیۡئًا ؕ اِنَّ وَعۡدَ اللّٰهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا ٝ وَ لَا یَغُرَّنَّكُمۡ بِاللّٰهِ الۡغَرُوۡرُ ﴿۳۳﴾
৩৩. হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর এবং সেদিনকে ভয় কর, যেদিন পিতা সন্তানের কোনো উপকারে আসবে না, সন্তানও তার পিতার কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং শয়তান যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে ধোঁকায় না ফেলে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এ আয়াতটিতে মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে এক গভীর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। আয়াতটির ভাষা সংক্ষিপ্ত হলেও এর মধ্যে আখিরাত, দুনিয়ার মোহ, শয়তানের প্রতারণা এবং তাকওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একত্রে উঠে এসেছে।
এখানে প্রথমেই ‘হে মানুষ’ বলে সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করা হয়েছে। এটি শুধু মুমিনদের জন্য নয়; বরং সব মানুষের জন্য এক সর্বজনীন আহ্বান। আল্লাহ মানুষকে প্রতিপালকের কথা স্মরণ করিয়ে বলছেন যে, যিনি সৃষ্টি করেছেন, লালন-পালন করছেন এবং একদিন তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে, সেই রবকে ভয় করা, তাঁর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকা এবং তাঁর আদেশ মেনে চলাই মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব।
এরপর আল্লাহ কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেছেন। পৃথিবীতে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হলো পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। একজন বাবা সন্তানের জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকেন, আবার সন্তানও অনেক সময় পিতামাতার জন্য অকাতরে কষ্ট সহ্য করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন পরিস্থিতি এত ভয়ংকর হবে যে, কেউ কারও উপকার করতে পারবে না, যদি না আল্লাহ অনুমতি দেন।
কোরআনের অন্য আয়াতেও এ বাস্তবতা এসেছে— ‘সেদিন মানুষ তার ভাই, তার মা, তার বাবা, তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকেও পালিয়ে বেড়াবে।’ (সুরা আবাসা, আয়াত : ৩৪-৩৬)
অর্থাৎ আখিরাতের মুক্তি হবে ব্যক্তিগত আমলের ভিত্তিতে। বংশ, পরিবার, সামাজিক মর্যাদা বা সম্পর্ক কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। এজন্য ইসলাম শুধু পারিবারিক পরিচয়ের ওপর ভরসা করতে শেখায় না; বরং ঈমান ও আমলের ওপর গুরুত্ব দেয়।
আয়াতে এরপর মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।’ এখানে প্রতিশ্রুতি বলতে কিয়ামত, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত-জাহান্নাম এবং পুনরুত্থানকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ দুনিয়ার অনেক বিষয় নিয়ে সন্দেহ করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ওয়াদা কখনো মিথ্যা হয় না। অনত্র এসেছে— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯)
তারপর আল্লাহ মানুষকে দুটি বড় প্রতারণা থেকে সতর্ক করেছেন।
প্রথমটি হলো দুনিয়ার জীবন। দুনিয়া মানুষকে চাকচিক্য, সম্পদ, ভোগ-বিলাস, ক্ষমতা ও দীর্ঘ স্বপ্নের মাধ্যমে এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে মানুষ আখিরাতকে ভুলে যায়। অথচ দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। এক আয়াতে বলা হয়েছে— ‘পার্থিব জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
দ্বিতীয় প্রতারণাকারী হলো শয়তান। সে মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করে। কখনো বলে, ‘এখনো অনেক সময় আছে’, কখনো বলে ‘আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, গুনাহ করলে সমস্যা নেই’, আবার কখনো মানুষকে অহংকারে ডুবিয়ে দেয়। এভাবে সে মানুষকে তওবা ও আমল থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, দুনিয়ার সৌন্দর্য ও শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে মানুষ যেন আখিরাতের প্রস্তুতি ভুলে না যায়, এটাই এখানে মূল শিক্ষা।
আয়াতটি আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—(১) আখিরাতের ভয় ও জবাবদিহির অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত রাখা। (২) আত্মীয়তা বা সম্পর্কের ওপর নয়, নিজের ঈমান ও আমলের ওপর ভরসা করা। (৩) দুনিয়ার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহকে ভুলে না যাওয়া। (৪) শয়তানের ধোঁকা ও গুনাহকে হালকা মনে করার প্রবণতা থেকে বাঁচা। (৫) মৃত্যু ও কিয়ামতের প্রস্তুতিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও ভোগবাদে এত বেশি ডুবে যাচ্ছে যে আখিরাতের চিন্তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবার, ক্যারিয়ার ও সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই নামাজ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধিকে অবহেলা করছে। এই আয়াত সেই ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, একদিন এমন সময় আসবে যখন পৃথিবীর সব সম্পর্ক ও পরিচয় নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, শুধু আমলই মানুষের সঙ্গী হবে।
তাই একজন মুমিনের উচিত দুনিয়াকে লক্ষ্য নয়, মাধ্যম হিসেবে দেখা; আর আখিরাতকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা।






