কোরআনের বাণী
যে ৫টি বিষয় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : লোকমান, আয়াত : ৩৪
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
اِنَّ اللّٰهَ عِنۡدَهٗ عِلۡمُ السَّاعَۃِ ۚ وَ یُنَزِّلُ الۡغَیۡثَ ۚ وَ یَعۡلَمُ مَا فِی الۡاَرۡحَامِ ؕ وَ مَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌ مَّاذَا تَكۡسِبُ غَدًا ؕ وَ مَا تَدۡرِیۡ نَفۡسٌۢ بِاَیِّ اَرۡضٍ تَمُوۡتُ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ﴿۳۴﴾
৩৪. নিশ্চয় আল্লাহর নিকটেই আছে কিয়ামত (সংঘটিত হওয়ার) জ্ঞান, তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন জরায়ুতে যা আছে। কেউ জানে না আগামী কাল সে কি অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন্ দেশে তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
পবিত্র কোরআনের সুরা লোকমানের এ আয়াতটি পবিত্র কোরআনের অন্যতম গভীর অর্থবহ আয়াত। মুফাসসিরগণ বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং তাঁর পরিপূর্ণ ইলম ও কর্তৃত্বকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা মানুষের হৃদয়ে বিনয়, ভয় এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ইমাম তাবারি, ইবনে কাসির, কুরতুবি, ফখরুদ্দীন রাজি, বাগভি ও আলুসি (রহ.)-সহ প্রায় সকল মুফাসসির এই আয়াতকে ‘মাফাতিহুল গায়েব’ বা অদৃশ্য জগতের চাবিসমূহের আয়াত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেছেন— ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই রয়েছে কিয়ামতের জ্ঞান।’
ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে, তার সুনির্দিষ্ট সময় কোনো নবী, ফেরেশতা বা সৃষ্টিজীব জানে না। এ জ্ঞান আল্লাহ তাঁর নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। এ কারণেই জিবরাইল (আ.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তিনি বলেন— ‘প্রশ্নকৃত ব্যক্তি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।’
ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, মানুষের কাছে কিয়ামতের কিছু আলামত প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু তার নির্দিষ্ট সময় গোপন রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ সর্বদা প্রস্তুত থাকে এবং গাফেল না হয়।
আয়াতে এরপর মহান আল্লাহ বলেন— ‘এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন।’
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, এখানে শুধু বৃষ্টি সৃষ্টি নয়; বরং কোথায়, কখন, কতটুকু, কী উপকার বা ক্ষতির জন্য বৃষ্টি হবে, সবকিছুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বোঝানো হয়েছে। মানুষ মেঘ দেখে অনুমান করতে পারে, কিন্তু বৃষ্টি নামানোর ক্ষমতা তার নেই। তাফসিরে আলুসিতে বলা হয়েছে, আল্লাহ কখনো বৃষ্টিকে রহমত করেন, কখনো শাস্তি। একই বৃষ্টি কোথাও জীবন দেয়, কোথাও ধ্বংস ডেকে আনে।
ফখরুদ্দীন রাজি (রহ.) এখানে একটি সূক্ষ্ম দিক উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মানুষ বিজ্ঞানের মাধ্যমে কিছু কারণ বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু কারণের পেছনের স্রষ্টাসুলভ নিয়ন্ত্রণ কেবল আল্লাহর। তাই বিজ্ঞান যত উন্নতই হোক, তা আল্লাহর ইলমের বিকল্প নয়।
আয়াতে এরপর আল্লাহ বলেছেন— ‘এবং তিনি জানেন জরায়ুতে যা আছে।’
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এখানে শুধু ছেলে বা মেয়ে বোঝানো হয়নি। বরং গর্ভস্থ সন্তানের পূর্ণ বাস্তবতা বোঝানো হয়েছে। সে সুন্দর না অসুন্দর, সুস্থ না অসুস্থ, নেককার না বদকার, দীর্ঘজীবী না স্বল্পজীবী, ধনী না দরিদ্র, সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগা, সবকিছু আল্লাহ জানেন।
ইমাম বাগভি (রহ.) বলেন, মানুষ আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে শিশুর লিঙ্গ জানতে পারে, কিন্তু শিশুর তাকদির, চরিত্র, রিজিক ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুই জানে না। অতএব আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত তথ্য জানা এ আয়াতের বিরোধী নয়।
ইমাম কুরতুবি এখানে হাদিস উদ্ধৃত করেছেন—
“মায়ের গর্ভে ভ্রূণের বয়স যখন একশ বিশ দিন হয়, তখন আল্লাহ
ফেরেশতা পাঠান। তিনি তার রিজিক, আমল,
আয়ু ও সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য লিখে দেন।”
—সহিহ বুখারি, সহিহ
মুসলিম
আয়াতে এরপর আল্লাহ বলেছেন— ‘কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে।’
তাফসিরে তাবারিতে এসেছে, মানুষ আগামী দিনের পরিকল্পনা করলেও সে জানে না, আগামীকাল তার জন্য কল্যাণ নাকি বিপদ অপেক্ষা করছে। সে লাভ করবে নাকি ক্ষতি, সুস্থ থাকবে নাকি অসুস্থ হবে, সম্মান পাবে নাকি অপমানিত হবে, এসব কিছুই অজানা।
ফখরুদ্দীন রাজি (রহ.) বলেন, এই অংশ মানুষের অহংকার ভেঙে দেয়। মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের ভ্রমে ডুবে থাকে, অথচ সে পরবর্তী মুহূর্তেরও মালিক নয়। এ কারণেই ইসলাম মানুষকে পরিকল্পনার পাশাপাশি “ইনশাআল্লাহ” বলতে শিক্ষা দেয়।
আয়াতে এরপর আল্লাহ বলেছেন— ‘এবং কেউ জানে না কোন ভূখণ্ডে তার মৃত্যু হবে।’
ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, মানুষ নিজের জন্মভূমিতে মৃত্যুর আশা করে, কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়। কত মানুষ সফরে, যুদ্ধে, সমুদ্রে, হাসপাতালে কিংবা নির্বাসনে মৃত্যুবরণ করেছে, যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি।
ইমাম আলুসি (রহ.) বলেন, এই আয়াত মানুষের হৃদয়ে দুনিয়ার প্রতি মোহ কমিয়ে আখিরাতমুখিতা সৃষ্টি করে। কারণ মানুষ জানে না, কোন মুহূর্তে কোথায় তার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘মানুষ দুনিয়ার জন্য এমনভাবে কাজ করে যেন সে চিরকাল বাঁচবে, অথচ মৃত্যু তাকে এমনভাবে অনুসরণ করছে, যেভাবে ছায়া মানুষকে অনুসরণ করে।’
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন— ‘নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।’
তাফসিরে কুরতুবিতে বলা হয়েছে, ‘আলীম’ অর্থ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছুর জ্ঞানসম্পন্ন, আর ‘খবীর’ অর্থ সৃষ্টির গভীরতম অবস্থা ও গোপন বাস্তবতা সম্পর্কেও পূর্ণ অবগত।
এই আয়াতের মাধ্যমে পবিত্র কোরআন মানুষকে কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা দেয়। ভবিষ্যৎ জানার দাবি করা গণক, জ্যোতিষী ও ভাগ্যবিচারকদের মিথ্যাচার থেকে দূরে থাকতে হবে। মানুষ যত উন্নতই হোক, তার জ্ঞান সীমিত। মৃত্যু ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়। একই সঙ্গে আয়াতটি মানুষকে বিনয়ী হতে শেখায়; কারণ সে নিজের আগামীকাল সম্পর্কেও নিশ্চিত নয়।
ইমাম শাওকানি (রহ.) বলেছেন, ‘এই আয়াত বান্দাকে শিক্ষা দেয়, তার প্রকৃত আশ্রয় একমাত্র আল্লাহ। কারণ গায়েবের জ্ঞান, জীবন-মৃত্যু ও তাকদিরের মালিক কেবল তিনিই।’






