মুসলিম জীবনে সদকার প্রভাব

প্রতীকী ছবি
মানুষের হাতে থাকা সম্পদ শুধু তার ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্য মানুষের অধিকার ও কল্যাণের দায়িত্ব। ইসলাম সেই দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করার জন্য সদকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সদকা মানে শুধু অর্থ দান নয়; আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় করা যেকোনো কল্যাণকর কাজই এর অন্তর্ভুক্ত। তাই একজন মুসলিমের জীবনে সদকা কোনো বিচ্ছিন্ন আমল নয়, বরং ব্যক্তির ঈমান, চরিত্র, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
পবিত্র কোরআন মানুষকে দানের প্রতি উৎসাহিত করতে গিয়ে বলেছে, ‘তোমরা যা ভালোবাসো, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করবে না’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৯২)। আয়াতটি সদকার একটি গভীর শিক্ষা সামনে আনে। মানুষ সাধারণত যে সম্পদকে নিজের প্রয়োজন ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য আঁকড়ে ধরে রাখে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার মধ্য থেকেই কিছু ছেড়ে দেওয়ার নাম ত্যাগ। এ ত্যাগই মানুষের অন্তরকে সম্পদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীল করে তোলে।
সদকার প্রথম প্রভাব পড়ে মানুষের নিজের অন্তরে। সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষের মধ্যে কৃপণতা, অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি করতে পারে। নিয়মিত দান সেই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। পবিত্র কোরআন মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছে, তারা স্বচ্ছলতা ও অভাব উভয় অবস্থায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)। অর্থাৎ দান শুধু অর্থ কমানোর বিষয় নয়, এটি এমন একটি নৈতিক প্রশিক্ষণ, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
সদকা মানুষের সম্পদকে কমিয়ে দেয় না, বরং ইসলামের দৃষ্টিতে তাতে বরকত সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাদাকাহ সম্পদ কমায় না’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)। এই হাদিসের অর্থ কেবল দৃশ্যমান অর্থনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ তার সম্পদ থেকে কিছু অন্যের কল্যাণে ব্যয় করলে তার হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ হয়তো সাময়িকভাবে কমে যায়, কিন্তু এর বিনিময়ে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি, মানুষের ভালোবাসা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরকালের সওয়াব অর্জন করে। পবিত্র কোরআন আরও বলেছে, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বর্ধিত করেন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৬)।
সদকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো মানুষের অন্তরে আল্লাহর ওপর আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া। সম্পদ আঁকড়ে রাখার প্রবণতার পেছনে অনেক সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় কাজ করে। মানুষ মনে করে, আজ যদি কিছু দিয়ে দিই, আগামী দিনে হয়তো আমার প্রয়োজন মিটবে না। কিন্তু মুমিন বিশ্বাস করে, তার রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। এ বিশ্বাস থেকেই সে দান করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেবেন’ (সুরা সাবা, আয়াত : ৩৯)। ফলে সদকা একজন মুসলিমকে শুধু দাতা বানায় না, তাকে তাওয়াক্কুলের শিক্ষাও দেয়।
সদকার প্রভাব ব্যক্তির সীমানা ছাড়িয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। একটি সমাজে যখন সামর্থ্যবান মানুষ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব কমে। ক্ষুধার্তের মুখে খাবার পৌঁছে যায়, অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পায়, শিক্ষার ব্যয় বহনে অক্ষম শিক্ষার্থী সহায়তা পায় এবং বিপদগ্রস্ত পরিবার নতুন করে দাঁড়ানোর শক্তি পায়। এভাবেই ব্যক্তির ছোট একটি দান বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের অংশ হয়ে ওঠে।
ইসলাম সদকাকে শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর সদকা রয়েছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, কেউ যদি কিছু না পায়? তিনি বললেন, সে নিজ হাতে কাজ করবে এবং নিজে উপকৃত হবে ও সদকা করবে। তারা বললেন, যদি সে তাও না পারে? তিনি বললেন, সে কোনো বিপদগ্রস্ত অভাবীকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, সেটিও যদি না পারে? তিনি বললেন, সে ভালো কাজের নির্দেশ দেবে। তারা বললেন, সেটিও যদি না পারে? তিনি বললেন, তাহলে সে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে, এটিই তার জন্য সদকা (বুখারি, হাদিস : ১৪৪৫)।
এই হাদিস সদকার ধারণাকে অত্যন্ত বিস্তৃত করে দিয়েছে। অর্থ না থাকলেও একজন মানুষ সদকা করতে পারে। কারও প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করা, ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া কিংবা নিজের দ্বারা অন্যের ক্ষতি না করা, সবই সদকার বিস্তৃত অর্থের মধ্যে পড়ে। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখে তোমার হাসি সদকা’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)। যাতে প্রমাণিত হয় যে, সদকা একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনকে কল্যাণের ধারায় পরিচালিত করার একটি উপায়।
তবে সদকার মূল্য শুধু দানের পরিমাণে নয়, দানের পদ্ধতিতেও নিহিত। পবিত্র কোরআন সতর্ক করে দিয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের সদকাকে নষ্ট করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৪)। অর্থাৎ কাউকে দান করার পর তাকে অপমান করা, নিজের দানের কথা প্রচার করা কিংবা তার প্রতি অনুগ্রহের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সদকার সৌন্দর্য নষ্ট করে। প্রকৃত সদকা হলো এমন দান, যাতে দাতা আল্লাহর সন্তুষ্টি চান এবং গ্রহীতার মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।
কোরআনুল কারীম গোপনে দানের বিশেষ মর্যাদার কথাও বলেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যদি সদকাসমূহ প্রকাশ্যে দাও, তবে তা উত্তম; আর যদি তা গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭১)। গোপন দানের মধ্যে লোকদেখানো প্রবণতা থেকে বেঁচে থাকার সুযোগ বেশি থাকে। তবে যেখানে প্রকাশ্যে দান করলে অন্যরা উৎসাহিত হয় এবং তাতে রিয়া বা প্রদর্শনের আশঙ্কা থাকে না, সেখানে প্রকাশ্য দানও বৈধ ও কল্যাণকর হতে পারে।
সদকা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দাতার জন্যও আখিরাতের পাথেয় তৈরি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মুমিনের ছায়া হবে তার সদকা’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৫)। দুনিয়ার জীবনে মানুষ যে সম্পদকে নিজের নিরাপত্তার অবলম্বন মনে করে, আখিরাতে সেই সম্পদই তার জন্য কতটুকু উপকারে আসবে, তা নির্ভর করবে সে তা কীভাবে ব্যবহার করেছে তার ওপর। তাই সদকা আসলে ভবিষ্যতের জন্য সম্পদকে অন্য এক রূপে সংরক্ষণ করা।
সদকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সদকায়ে জারিয়া। মানুষের মৃত্যুর পর তার আমল বন্ধ হয়ে গেলেও তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকে, এর মধ্যে সদকায়ে জারিয়াও রয়েছে (মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)। সদকায়ে জারিয়া হলো এমন কোনো কল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করা, যার উপকার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তা দাতার মৃত্যুর পরও সওয়াবের ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করতে পারে। একটি পানির ব্যবস্থা, উপকারী জ্ঞান প্রচার, মসজিদ বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী অবদান কিংবা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপকারে আসে।
তাই আজকের ভোগবাদী সমাজে সদকার প্রয়োজন আরও গভীর। সম্পদ অর্জন যখন জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের মধ্যে ‘আমার’ ও ‘আমার জন্য’ প্রবণতা বাড়তে থাকে। সদকা সেই আত্মকেন্দ্রিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বলে, তোমার সম্পদের মধ্যেও অন্যের অধিকার ও প্রয়োজনের কথা স্মরণ করো। এটি মানুষের হৃদয়ে মমতা জাগায়, সমাজে সহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি করে এবং সম্পদকে শুধু ভোগের উপকরণ না বানিয়ে কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের শিক্ষা দেয়।
সদকা মুসলিম জীবনের ঈমানি ও নৈতিক সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের হৃদয়কে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে, আল্লাহর ওপর আস্থা বাড়ায়, মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ায় এবং নিজের জন্য আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করে। একটি মুদ্রা, একবেলা খাবার, একজন অসহায়ের চিকিৎসা, একটি ভালো কথা কিংবা কারও মুখে হাসি ফোটানোর মতো যেকোনো কল্যাণকর কাজই হতে পারে সাদাকাহর দরজা। সেই দরজা যত বেশি মানুষের জন্য খুলবে; ব্যক্তি ও সমাজের জীবন তত বেশি মানবিক ও আলোকিত হবে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






