হাদিসের কথা
পিতার বন্ধুর প্রতি সন্তানের দায়িত্ব

ছবি: আগামীর সময়
মানুষের মহত্ত্ব শুধু তার ইবাদতে নয়, বরং তার আচরণেও প্রকাশ পায়। বিশেষ করে সম্পর্কের প্রতি বিশ্বস্ততা, পুরোনো ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা এবং মৃত মানুষের স্মৃতিকে সম্মান করা ইসলামের এক অনন্য শিক্ষা। ইসলাম এমন এক মানবিক সমাজ গড়তে চায়, যেখানে বন্ধুত্ব মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না; বরং প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতেও তার আপনজনদের প্রতি ভালোবাসা ও সৌজন্য অব্যাহত থাকে। সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল এ শিক্ষার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাদের হৃদয়ে ছিল নববী আদর্শের গভীর প্রভাব, যা ছোট ছোট আচরণেও ফুটে উঠত অত্যন্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ كَانَ إِذَا خَرَجَ إِلَى مَكَّةَ كَانَ لَهُ حِمَارٌ يَتَرَوَّحُ عَلَيْهِ إِذَا مَلَّ رُكُوبَ الرَّاحِلَةِ وَعِمَامَةٌ يَشُدُّ بِهَا رَأْسَهُ فَبَيْنَا هُوَ يَوْمًا عَلَى ذَلِكَ الْحِمَارِ إِذْ مَرَّ بِهِ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ أَلَسْتَ ابْنَ فُلاَنِ بْنِ فُلاَنٍ قَالَ بَلَى . فَأَعْطَاهُ الْحِمَارَ وَقَالَ ارْكَبْ هَذَا وَالْعِمَامَةَ - قَالَ - اشْدُدْ بِهَا رَأْسَكَ . فَقَالَ لَهُ بَعْضُ أَصْحَابِهِ غَفَرَ اللَّهُ لَكَ أَعْطَيْتَ هَذَا الأَعْرَابِيَّ حِمَارًا كُنْتَ تَرَوَّحُ عَلَيْهِ وَعِمَامَةً كُنْتَ تَشُدُّ بِهَا رَأْسَكَ . فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ صِلَةَ الرَّجُلِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ بَعْدَ أَنْ يُوَلِّيَ " . وَإِنَّ أَبَاهُ كَانَ صَدِيقًا لِعُمَرَ .
‘ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত যে, যখন তিনি মক্কাহ অভিমুখে রওনা হতেন তখন তার সাথে একটি গাধা থাকত। উটের সওয়ারীতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ক্ষণিক স্বস্তি লাভের জন্য তাতে আরোহণ করতেন। আর তার সঙ্গে একটি পাগড়ী থাকত, যা দিয়ে তিনি মাথা বেঁধে নিতেন। কোনো এক সময় তিনি উক্ত গাধায় আরোহণ করে যাচ্ছিলেন, তখন তার পাশ দিয়ে একজন বেদুঈন অতিক্রম করছিল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি অমুকের পুত্র অমুক নও? সে বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি তাকে গাধাটি দিয়ে দিলেন এবং বললেন, এতে আরোহণ কর। তিনি তাকে পাগড়ীটিও দান করলেন এবং বললেন, এটি দ্বারা তোমার মাথা বেঁধে নাও।
তখন তার সঙ্গীদের কেউ কেউ তাকে বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি এ বেদুঈনকে গাধাটি দিয়ে দিলেন, যার উপর আরোহণ করে আপনি স্বস্তি লাভ করতেন এবং পাগড়ীটিও দান করলেন, যার দ্বারা আপনার মাথা বাঁধতেন।
তখন তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার হলো কোনো ব্যক্তির পিতার ইন্তিকালের পর তার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখা। আর এ বেদুঈনের পিতা ছিলেন উমর (রা.) এর অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫২)
এই হাদিস শুধু একটি দানের ঘটনা নয়; বরং এটি ইসলামের সম্পর্কবোধ, কৃতজ্ঞতা ও মানবিক সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হতে পারে, ইবনে উমর (রা.) একজন বেদুঈনকে একটি গাধা ও পাগড়ি উপহার দিয়েছেন। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এর পেছনে ছিল হৃদয়ের এক অসাধারণ বিশ্বস্ততা এবং নববী শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।
ইবনে উমর (রা.) যে গাধাটি দান করেছিলেন, সেটি ছিল তাঁর সফরের সঙ্গী। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি দূর করতে তিনি সেটিতে আরোহণ করতেন। পাগড়িটিও ছিল তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জিনিস। অর্থাৎ তিনি অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় কিছু দান করেননি; বরং নিজের প্রয়োজনীয় ও প্রিয় জিনিসই উপহার দিয়েছেন। এটি সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তারা দান করতেন হৃদয় থেকে, শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন তিনি ওই বেদুঈনের প্রতি এত সম্মান ও উদারতা দেখালেন? এর উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই শিক্ষার কথা স্মরণ করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে, একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সদাচার বজায় রাখা সর্বোত্তম নেক আমলগুলোর একটি। অর্থাৎ ইসলাম শুধু জীবিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে বলে না; বরং মৃত মানুষের স্মৃতিকেও সম্মান করতে শেখায়। কারও পিতা বা প্রিয়জন পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরও তার বন্ধুদের খোঁজ নেওয়া, তাদের সম্মান করা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা দেখানো ইসলামের দৃষ্টিতে মহৎ চরিত্রের পরিচয়।
এখানে আরও একটি গভীর দিক রয়েছে। ইবনে উমর (রা.) মূলত তাঁর পিতা উমর (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। কারণ ওই বেদুঈনের পিতা ছিলেন উমর (রা.)-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অর্থাৎ তিনি বন্ধুর ছেলের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিজের পিতার সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। এটি আমাদের শেখায়, পূর্বসূরিদের সুন্দর সম্পর্কগুলো সংরক্ষণ করাও নেক আমলের অংশ।
আজকের সমাজে সম্পর্কগুলো ক্রমেই স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। মানুষ উপকার শেষ হলে সম্পর্কও ভুলে যায়। এমনকি অনেক সময় পিতা-মাতার বন্ধু বা আত্মীয়দের প্রতিও কোনো খোঁজখবর রাখা হয় না। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম চায়, মানুষের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা ও স্মৃতির মর্যাদা বেঁচে থাকুক। কারণ যে মানুষ পুরোনো সম্পর্কের মর্যাদা দিতে জানে, সে-ই প্রকৃত অর্থে উন্নত চরিত্রের অধিকারী।
এই হাদিস আরও শেখায়, ছোট একটি আচরণও আল্লাহর কাছে অনেক বড় মর্যাদা লাভ করতে পারে, যদি তার পেছনে থাকে আন্তরিকতা ও উত্তম নিয়ত। ইবনে উমর (রা.)-এর এই ঘটনা তাই শুধু ইতিহাস নয়; বরং আমাদের সামাজিক ও নৈতিক জীবনের জন্য এক অনন্য দিকনির্দেশনা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


