কোরআনের বাণী
আল্লাহর ক্ষমা পেতে মানুষকেও ক্ষমা করতে হয়

কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২২
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ لَا یَاۡتَلِ اُولُوا الۡفَضۡلِ مِنۡكُمۡ وَ السَّعَۃِ اَنۡ یُّؤۡتُوۡۤا اُولِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡمَسٰكِیۡنَ وَ الۡمُهٰجِرِیۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۪ۖ وَ لۡیَعۡفُوۡا وَ لۡیَصۡفَحُوۡا ؕ اَلَا تُحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰهُ لَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
২২. আর তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্ৰহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থকে ও আল্লাহ্র রাস্তায় হিজরতকারীদেরকে কিছুই দেবে না; তারা যেন ওদেরকে ক্ষমা করে এবং ওদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা নূরের এই আয়াত ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্য, ক্ষমা ও আত্মিক মহত্ত্বের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে। আয়াতটি নাজিল হয়েছিল আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপবাদের ঘটনার প্রেক্ষিতে ইতিহাসে এটি ‘হাদিসাতুল ইফক’ নামে পরিচিত।
মুনাফিকদের ছড়ানো সেই অপবাদের ঘটনায় কিছু সরলমনা মুসলিমও অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের মধ্যে মিসতাহ ইবনে উসাসা (রা.) এবং কবি হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো বড় সাহাবিরাও ছিলেন। এ দুজন সাহাবিই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ঘটনাটি ছিল তাদের জীবনের একটি বড় ভুল। তবে তারা পরবর্তীতে আন্তরিক তাওবা করেন এবং দয়ময় আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুলও করেছেন।
আল্লাহ তাআলা যেমন কোরআনের আয়াত নাজিল করে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন, তেমনি এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়া মুসলিমদের জন্যও ক্ষমা ও সংশোধনের পথ উন্মুক্ত রেখেছেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে ভুলের দরজা যেমন আছে, তেমনি তাওবা ও ফিরে আসার দরজাও খোলা।
মিসতাহ (রা.) ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর আত্মীয় এবং অত্যন্ত দরিদ্র। আবু বকর (রা.) নিয়মিত তাকে আর্থিক সাহায্য করতেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, মিসতাহও অপবাদের আলোচনায় জড়িয়ে পড়েছেন, তখন একজন পিতা হিসেবে তিনি গভীরভাবে কষ্ট পান। স্বাভাবিকভাবেই তিনি শপথ করেন যে, ভবিষ্যতে আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক সাহায্য করবেন না।
এমন পরিস্থিতিতে এই আয়াত নাজিল হয়। তাফসিরে কুরতুবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করা বন্ধ করে দেওয়া সাধারণভাবে গুনাহ না হলেও সাহাবায়ে কেরামকে আল্লাহ তাআলা মানবজাতির জন্য আদর্শ চরিত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তাই আবু বকর (রা.)-কে আরও উচ্চতর নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়, তিনি যেন নিজের শপথ ভঙ্গ করে কাফফারা আদায় করেন এবং পুনরায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
আয়াতের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ হলো—
أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ
‘তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’
এই বাক্য শুনে আবু বকর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন—
بَلَىٰ وَاللّٰهِ يَا رَبَّنَا إِنَّا لَنُحِبُّ أَنْ تَغْفِرَ لَنَا
‘অবশ্যই হে আমাদের রব! আল্লাহর কসম, আমরা অবশ্যই চাই আপনি আমাদের ক্ষমা করুন।’
এরপর তিনি পুনরায় মিসতাহ (রা.)-কে আর্থিক সাহায্য দেওয়া শুরু করেন এবং ঘোষণা করেন যে, এ সাহায্য আর কখনো বন্ধ করবেন না। (বুখারি, হাদিস : ৪৭৫৭; মুসলিম, হাদিস : ২৭৭০)
এই আয়াত মুসলিম সমাজকে এক অসাধারণ শিক্ষা দেয়। মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু ভুলের পর তার তাওবা, সংশোধন ও ফিরে আসার সুযোগ থাকতে হবে। একইসঙ্গে যার প্রতি অন্যায় হয়েছে, তার মধ্যেও ক্ষমা, উদারতা ও মহানুভবতা থাকা প্রয়োজন।
ইসলাম প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাকে অধিক মর্যাদা দিয়েছে। কারণ যে মানুষ অন্যকে ক্ষমা করতে পারে, আল্লাহও তার জন্য ক্ষমার দরজা খুলে দেন। এই আয়াত আমাদের শেখায়, সম্পর্কের ভাঙন নয়, বরং ক্ষমা ও সহমর্মিতাই একটি ঈমানি সমাজের ভিত্তি।




