পরিবারই শিশুর চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয়

প্রতীকী ছবি
একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক তার বাবা-মা। শিশুর ভাষা, আচরণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় চেতনার বীজ রোপিত হয় পরিবারের পরিবেশেই। আধুনিক মনোবিজ্ঞান যেমন পারিবারিক পরিবেশকে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রধান ভিত্তি বলে, তেমনি ইসলামও সন্তান প্রতিপালনে পরিবারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত : ৬)। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, এই আয়াতের অন্যতম দাবি হলো পরিবারকে সঠিক শিক্ষা, আদব-আখলাক ও দ্বীনি অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে তোলা। (তাফসির ইবন কাসির)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন ব্যক্তি তার পরিবারের অভিভাবক এবং সে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)। এই হাদিস প্রমাণ করে, সন্তানকে শুধু ভরণ-পোষণ নয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষায় গড়ে তোলাও বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব।
শিশুরা উপদেশের চেয়ে অনুকরণ থেকে বেশি শেখে। তাই বাবা-মা যদি সত্যবাদী, আমানতদার, বিনয়ী ও নামাজে যত্নবান হন, তবে সন্তানের মধ্যেও এসব গুণ সহজেই বিকশিত হয়। অন্যদিকে ঘরে যদি মিথ্যা, অশোভন ভাষা, পারিবারিক কলহ বা অসৌজন্যমূলক আচরণ নিয়মিত দেখা যায়, তবে শিশুর চরিত্রেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণেই ইসলাম কথার চেয়ে উত্তম চরিত্র ও বাস্তব আমলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
পারিবারিক পরিবেশে ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন শিশুকে ভীত ও আত্মবিশ্বাসহীন করে তুলতে পারে, তেমনি সীমাহীন প্রশ্রয় তাকে দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলতে পারে। মহানবী (সা.) শিশুদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করতেন, আবার প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও শৃঙ্খলার দিকেও গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। তাই অভিভাবকদের উচিত প্রযুক্তি ব্যবহারে ভারসাম্য শেখানো, সন্তানকে উপকারী বই পড়তে উৎসাহিত করা, কোরআন তিলাওয়াত ও নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অর্থবহ সময় কাটানো। লোকমান (আ.) তার সন্তানকে যেভাবে ঈমান, ইবাদত, উত্তম চরিত্র ও বিনয়ের শিক্ষা দিয়েছিলেন (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৩-১৯), তা আজও প্রতিটি পরিবারের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
একটি আদর্শ পরিবার শুধু আর্থিক স্বচ্ছলতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে না; বরং ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধর্মীয় অনুশীলন, নৈতিক শিক্ষা ও সৎ আচরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। যে পরিবারে আল্লাহর স্মরণ, সত্যবাদিতা ও সুন্দর আখলাকের চর্চা থাকে, সেই পরিবার থেকেই সমাজের জন্য আদর্শ মানুষ তৈরি হয়। তাই শিশুর চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম বিনিয়োগ হলো একটি সুস্থ, নৈতিক ও ইসলামি মূল্যবোধসমৃদ্ধ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




