পিতা-মাতাকে অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতি

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের বড় নিয়ামতগুলোর অন্যতম একটি হচ্ছে পিতা-মাতা। তারাই প্রতিটি ব্যক্তির পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম। দুনিয়াতে লালন-পালন, শিক্ষাদীক্ষা ও আত্মত্যাগের ক্ষেত্রেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই ইসলাম পিতা-মাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহতাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আধুনিক সমাজে এমন অনেক সন্তান দেখা যায়, যারা নিজের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা বা অর্থনৈতিক অবস্থানকে বড় করে দেখাতে গিয়ে কিংবা অন্য কোনো দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য পিতা-মাতাকে অস্বীকার করে বসে। তাদের পরিচয় গোপন করে ফেলে। কেউ তো সম্পর্ক অস্বীকার করে ফেলে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, বরং একটি গুরুতর পাপ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বংশপরিচয় অস্বীকার করার ভয়াবহতা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন,
مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ غَيْرُ أَبِيهِ فَالْجَنَّةُ عَلَيْهِ حَرَامٌ
‘যে ব্যক্তি জেনে-শুনে নিজ পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬৬)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَا تَرْغَبُوا عَنْ آبَائِكُمْ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ أَبِيهِ فَهُوَ كُفْرٌ
‘তোমরা তোমাদের পিতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। যে ব্যক্তি নিজের পিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তা কুফরিসদৃশ কাজ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬৮)
এখানে কুফর বলতে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়নি; বরং অকৃতজ্ঞতা ও জঘন্য পাপের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে।
পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা শুধু তাদের প্রতি অবিচার নয়, বরং নিজের শিকড়, নিজের ইতিহাস ও আল্লাহ প্রদত্ত পরিচয়কে অস্বীকার করা। একজন সন্তান পৃথিবীর যেখানেই পৌঁছাক না কেন, তার সাফল্যের পেছনে পিতা-মাতার ত্যাগ, শ্রম ও দোয়া জড়িয়ে থাকে। অথচ কেউ যদি ধন-সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সামাজিক মর্যাদার কারণে দরিদ্র কিংবা অশিক্ষিত পিতা-মাতাকে অস্বীকার করে, তবে সে মানবিকতা ও ইমানি চেতনার গভীর সংকটে পতিত হয়।
ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) নিজেদের বংশপরিচয় সংরক্ষণে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। কারণ বংশপরিচয় রক্ষা করা ইসলামের সংরক্ষিত মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর (مقاصد الشريعة) একটি। এজন্যই ইসলাম দত্তক সন্তানকে প্রকৃত পিতার নামেই পরিচিত করার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহতাআলা বলেছেন,
ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ
‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতাদের নামেই ডাকো; এটিই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত।’ (সুরা আল-আহজাব, আয়াত : ৫)
পিতা-মাতাকে অস্বীকার করার আরেকটি ভয়াবহ পরিণতি হলো, এতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জিত হয়। হাদিসে এসেছে,
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ
‘পিতার সন্তুষ্টিতে রবের সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে রবের অসন্তুষ্টি নিহিত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৯৯)
আজকের সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি, বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা এবং পারিবারিক সম্পর্কের দুর্বলতা আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। যারা আজ পিতা-মাতাকে অস্বীকার করছে বা তাদের সম্মান দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে, তাদের মনে রাখা উচিত, একদিন তারাও বার্ধক্যে উপনীত হবে এবং নিজেদের সন্তানদের কাছ থেকে একই আচরণের সম্মুখীন হতে পারে।
অতএব, পিতা-মাতাকে অস্বীকার করা বা তাদের পরিচয় গোপন করা কোনো সভ্য সমাজ কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি একটি গুরুতর গুনাহ, যা দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং আখিরাতে কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, তাদের সম্মান করা, তাদের পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে ধারণ করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের হক আদায়ের চেষ্টা করা। কেননা পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর তাদের সম্মান রক্ষার মধ্যেই নিহিত রয়েছে একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক





