হাদিসের আলোকে শাসকের সাফল্য-ব্যর্থতায় সহকারীর ভূমিকা
- সুপরামর্শে গড়ে ওঠে কল্যাণকর নেতৃত্ব
- ক্ষমতার পাশে কেমন মানুষ থাকা উচিত

প্রতীকী ছবি
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একজন শাসক বা প্রশাসকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার চারপাশের মানুষের সততা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতা। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, অনেক যোগ্য শাসক ভুল পরামর্শের কারণে বিপথে অগ্রসর হয়েছেন। আবার অনেক সাধারণ শাসক সৎ ও বিচক্ষণ সহকারীদের কারণে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলাম এ বাস্তবতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ তাআলা কোনো প্রশাসক বা শাসনকর্তার মঙ্গল চান, তখন তাকে উত্তম সহকারী দান করেন। সে শাসক আল্লাহর কোনো বিধান ভুলে গেলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্মরণ থাকলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে। আর যখন আল্লাহ কোনো শাসকের অমঙ্গল চান, তখন তার জন্য মন্দ সহকারী নির্ধারণ করা হয়। ফলে সে ভুলে গেলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় না এবং স্মরণ করলেও তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ২৯৩২; নাসায়ি, হাদিস: ৪২০৪)
এই হাদিসে নেতৃত্বের একটি মৌলিক নীতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একজন শাসক বা প্রশাসক মানুষ হিসেবে ভুল করতে পারেন, কোনো বিষয় ভুলে যেতে পারেন বা কোনো সিদ্ধান্তে দুর্বলতা দেখাতে পারেন। কিন্তু তার পাশে যদি এমন মানুষ থাকে, যারা আল্লাহভীরু, সত্যবাদী ও কল্যাণকামী, তাহলে তারা তাকে সঠিক পথের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এ ধরনের সহকারী শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য রহমত।
তার বিপরীত দিকে খারাপ পরামর্শদাতারা শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। তারা সত্য গোপন করে, অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে, ব্যক্তিস্বার্থকে জনকল্যাণের ওপর প্রাধান্য দেয় এবং শাসককে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। ফলে অন্যায়, দুর্নীতি ও অবিচার ধীরে ধীরে সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ২) এই নীতি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘দ্বীন হলো কল্যাণকামিতা (নসিহত)।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৫) অর্থাৎ সত্য ও কল্যাণের উপদেশ দেওয়া ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। একজন সৎ উপদেষ্টা কখনো শাসকের ভুলকে প্রশ্রয় দেন না; বরং যথাযথ আদব ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাকে সত্যের দিকে আহ্বান করেন। কারণ প্রকৃত আনুগত্য ব্যক্তির প্রতি নয়, আল্লাহর বিধানের প্রতি।
ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ এ শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আবু বকর (রা.) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর জনগণকে বলেছিলেন, ‘আমি যদি সঠিক পথে থাকি, তবে আমাকে সহযোগিতা করো; আর যদি বিচ্যুত হই, তবে আমাকে সংশোধন করে দিও।’ এই বক্তব্য প্রমাণ করে, ইসলামে জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং গঠনমূলক সমালোচনার কত বড় মূল্য রয়েছে।
বর্তমান সময়েও এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা কিংবা সামাজিক সংগঠন, সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে সৎ, দক্ষ ও নীতিবান সহযোগীদের ওপর। যারা শুধু প্রশংসা করে, ভুল আড়াল করে বা ব্যক্তিগত স্বার্থে সত্য গোপন করে, তারা নেতৃত্বকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। পক্ষান্তরে যারা সততা, আমানতদারিতা ও আল্লাহভীতির ভিত্তিতে পরামর্শ দেয়, তারা একটি প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা ও উন্নতির প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব, নেতৃত্বের অবস্থানে থাকলে সৎ ও যোগ্য মানুষকে সহযোগী হিসেবে বেছে নেওয়া এবং সহযোগীর দায়িত্বে থাকলে সত্যনিষ্ঠ, বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী হওয়া। কারণ একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের পেছনে যেমন সৎ উপদেষ্টার অবদান থাকে, তেমনি একজন ব্যর্থ শাসকের পেছনেও অনেক সময় অসৎ পরামর্শদাতাদের ভূমিকা থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন মানুষ হওয়ার তাওফিক দান করুন, যারা সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করে এবং সমাজে কল্যাণ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। আমিন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






