দৃষ্টিপাত
সরলতা ও দায়বদ্ধতার বার্তা দিচ্ছেন তারেক রহমান

তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার নানা ক্ষেত্রে সরলতা, সংযম এবং মানুষের ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যেই তাঁর সাম্প্রতিক সময়ের উদ্যোগগুলো সামনে এসেছে। ক্ষমতার জৌলুস নয়, বরং দায়িত্ববোধকে সামনে আনার একটি প্রয়াস এতে স্পষ্ট।
এই বার্তার প্রথম প্রকাশ দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর নিজের চলাচলের ব্যবস্থায়। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না। নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি, নিজস্ব চালক এবং নিজের কেনা জ্বালানি দিয়েই চলাচল করবেন। পদ যত বড়ই হোক, সেটি ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের মাধ্যম নয়, জনসেবার দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে সেই উপলব্ধিরই প্রতিফলন দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর নিয়েও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে ১২ থেকে ১৪টি গাড়ির দীর্ঘ বহর চলত, সেখানে সেটি কমিয়ে এখন চারটি গাড়িতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ভিভিআইপি চলাচলের সময় সড়ক বন্ধ রাখা বা দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে রাখার প্রথাও বাতিল করা হয়েছে। আগে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি চলার সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ উপস্থিতি ছিল নিয়মিত দৃশ্য। সেই প্রথাও তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনের জীবনে পথে নামা কোটি মানুষের কথা ভেবে নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলো অনেকের কাছেই স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে। নাগরিক জীবনের স্বাভাবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি ইঙ্গিত এতে পাওয়া যায়।
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কক্ষের অর্ধেক লাইট বন্ধ রাখা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। হয়তো এটি ছোট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে এমন উদ্যোগ অন্যদের জন্যও একটি বার্তা তৈরি করে।
প্রশাসনিক কাজের ধরনেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। অধিকাংশ মন্ত্রিসভা বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে না করে সচিবালয়ে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করার চেষ্টা স্পষ্ট হয়। পাশাপাশি কাজের গতি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শনিবারও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সরকারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রেও তিনি একই ধরনের সংযমের বার্তা দিয়েছেন। ঘোষণা করা হয়েছে, মন্ত্রীরা আর বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না। তাঁরা সাধারণ সাদা টয়োটা গাড়িতে চলবেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবস্থাই ব্যবহার করবেন। সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত চালক বা সরকারি জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগও থাকবে না। এতে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর কমানোর একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকলেও এসেছে পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে যাওয়া এবং ফেরার সময় বিমানবন্দরে উপস্থিতির তালিকা সীমিত করা হয়েছে। এখন জ্যেষ্ঠ একজন মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, মন্ত্রিপরিষদসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবসহ মোট চারজন সেখানে থাকবেন। এর আগে এমন রাষ্ট্রাচারে প্রায় ১৮ জন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির উপস্থিতি নির্ধারিত ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই নির্দেশনাও বাতিল করা হয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর কমিয়ে বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার মাহফিল আয়োজন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। কূটনীতিকদের সম্মানে একটি এবং এতিম ও আলেম-উলামাদের সম্মানে আরেকটি, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দুটি ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
রাজনীতিতে অনেক সময় বড় পরিবর্তন শুরু হয় ছোট ছোট সিদ্ধান্ত দিয়ে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সময়ের পদক্ষেপগুলো সেই ধরনেরই কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। সময়ই বলে দেবে এসব সিদ্ধান্ত কতটা স্থায়ী হয় এবং প্রশাসনের ভেতরে কতটা প্রভাব ফেলে। তবে শুরুতেই যে বার্তাটি সামনে এসেছে, তা স্পষ্ট। রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সাধারণ মানুষ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবন।

