আগামীর চোখ
পুলসিরাতের প্রথম পাঠ

বরাবর
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ, টঙ্গী, গাজীপুর
জনাব, সালাম গ্রহণ করিবেন। দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশ্বমানের করার মহতী উদযোগ যখন চারিদিকে দ্যুতি ছড়াইতেছে, তখন গাজীপুরের টঙ্গীর ঐতিহ্যবাহী ১১২ বছরের গুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনন্য শিক্ষা পদ্ধতি দেখিয়া এক অভিভাবক হিসেবে আমি চরমভাবে মুগ্ধ ও অভিভূত।
ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশের যুগে আমাদের সন্তানেরা কেবল কেতাবি বিদ্যায় সীমাবদ্ধ থাকিবে, তাহা তো হইতে পারে না! তাই আপনারা বিদ্যালয়ের সম্মুখে যে জরাজীর্ণ, নড়বড়ে ও ফাঁকা ফাঁকা বাঁশের সাঁকোটি স্থায়ী রূপক হিসেবে স্থাপন করিয়াছেন, তাহার জন্য সিটি করপোরেশনকে জানাই শতকোটি ধন্যবাদ। এই সাঁকো কোনো সাধারণ সাঁকো নহে; ইহা হইল আমাদের ‘প্রাথমিক শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ’। প্রতিদিন সকালে কচি-কাঁচারা যখন জীবন হাতে লইয়া, পা পিছলে খালে পড়িবার ভয়কে জয় করিয়া এই নড়বড়ে সাঁকোটিতে পদার্পণ করে, তখনই মূলত তাহাদের শারীরিক ও মানসিক সার্কাস শিক্ষার শুভসূচনা ঘটে।
এই সাঁকো কোনো সাধারণ সাঁকো নহে; ইহা হইল আমাদের ‘প্রাথমিক শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ’
আমাদের মহান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাতৃভক্তির টানে উত্তাল দামোদর নদী সাঁতরে পার হইয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে তো দামোদর সাঁতরাইতে হইয়াছিল প্রাপ্তবয়সে। অথচ আপনারা আমাদের কোমলমতি শিশুদের সাত-আট বছর বয়সেই সেই বিদ্যাসাগর বানাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন! বর্ষাকালে যখন খালের তীব্র স্রোত ও পিচ্ছিল বাঁশ মিলিয়া এক মরণফাঁদ তৈরি করে, তখন সহকারী শিক্ষকরা হাত ধরিয়া পার করান— যাহা শিক্ষার্থীদের ‘পারস্পরিক সহযোগিতা ও টিমওয়ার্ক’ শিক্ষার এক বাস্তব উদাহরণ। আর খেলার মাঠে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় ফুটবল খালের জলে পড়িলে শিশুরা যে উদ্ধার অভিযান চালায়, তাহাতে তাহাদের ‘অ্যাডভেঞ্চার ট্রেইনিং’ ও বিনামূল্যে সাঁতার শেখা নিশ্চিত হইতেছে। শুভশ্রী মল্লিক কিংবা তুহিনের মতো শিক্ষার্থীরা মাঝেমধ্যে আছাড় খাইয়া রক্তাক্ত হইলেও আমরা বুঝি, ‘কষ্ট বিনা কি মেলে কেষ্ট!’
শুনিয়াছি, নির্বাচন আসিলে সাঁকোটি সাময়িক মায়াজাল দিয়া মেরামত করা হয়, কারণ নির্বাচন তো এক মায়াবী উৎসব! মায়াজাল কাটিয়া গেলে সাঁকো আবার তাহার রূপক ও নড়বড়ে রূপে ফিরিয়া আসে। ইহা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীদের জীবনের অনিত্যতা ও ক্ষণস্থায়িত্বের পরম সত্য শিক্ষা দেয়।
অতএব, একটি স্থায়ী ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ করিয়া আমাদের কোমলমতিদের এই রোমাঞ্চকর ‘ব্যবহারিক জীবন সংগ্রাম’ শিক্ষা হইতে বঞ্চিত করিবেন না। আর যদি ভুলক্রমে সেতু নির্মাণ করতেই হয়, তবে জেলা প্রশাসক মহোদয় ও আপনাদের মধ্যকার ‘দায় ঠেলাঠেলি’ নামক ক্লাসিক নাটকটির যেন শুভ সমাপ্তি ঘটে।
ইতি
এক চিরতটস্থ অভিভাবক



