আগামীর সময়

একলা মন্ত্রীর লড়াই

একলা মন্ত্রীর লড়াই

প্রতীকী ছবি

নেতা পাতিনেতা বেষ্টিত। একনিষ্ঠ কর্মী আবেগী সমর্থকদেরও অভাব থাকে না। ময়দানের লড়াইয়ে লাল্লু-পাঞ্জুরা ঘুরঘুর করলেও মন্ত্রী হয়ে একা হয়ে যান নেতা। মহাগুরুদায়িত্ব নিয়ে অজানা পরিবেশে যাত্রা শুরু তার। মিডিয়ার চোখ ঝলসানো ফোকাসে আরও আড়ষ্টতা পেয়ে বসে। ঘাড়ের ওপড় চৌকষ আমলার শীতল নিঃশ্বাস। দলীয় ও জাতীয় প্রত্যাশার চাপ সঙ্গে। সবকিছু মিলে বিবর্ণভাবেই ইনিংস শুরু করেন মন্ত্রীরা।

নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর পতাকা উড়িয়ে মন্ত্রীরা যখন সচিবালয়ে যান তখন তাদের স্বাগত জানান মন্ত্রণালয়ের সবশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রথম দিনই সান্নিধ্যে যাওয়ার ‘ধান্ধায়’ থাকেন তারা। কাকে ছেড়ে কাকে নিজের কথা বলবেন তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয় নবাগতের মধ্যে। সেদিনই মিডিয়ার কিছু ঝাঁঝালো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হন। প্রথম দিনই জানাতে হয় তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য। মন্ত্রণালয়ের চ্যালেঞ্জ। কাজ শুরুর আগেই কিভাবে চ্যালেঞ্জ জানবেন?

যদিও পুরনো মন্ত্রী অর্থাৎ আগে যারা মন্ত্রিগিরি করেছেন তাদের এ সমস্যা হয় না। কিন্তু এবার নতুন পুরনো মিশেল মন্ত্রিসভার কথা শোনা যাচ্ছে। যেখানে আনকোরাদের অনেক বেশি জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। অবশ্য নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো সুযোগ নেই। সারা বিশ্বই নতুনদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। জেন জি ভাবনা থেকেই আরও নতুনরা জায়গা পাচ্ছেন। যেন তারা ‘অন্য নতুনদের’ ভাবনা বুঝতে পারেন।

যুক্তরাজ্যে আছে ছায়া মন্ত্রিসভা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাজ ছায়ামন্ত্রীর নিবিড় পর্যবেক্ষণে ঝালাই হয়। ধীরে ধীরে ছায়ামন্ত্রীও মন্ত্রীর মতো দক্ষ হয়ে ওঠে। তারা হচ্ছে অপেক্ষমাণ সরকার। যারা এখন ক্ষমতায় নেই কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কী করবে, তার পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুত থাকে। এ ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক রীতি। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়ামন্ত্রী থাকেন। তারা বিকল্প বাজেট ও নীতি প্রস্তুত করে। কাঠামোবদ্ধভাবে সরকারের সমালোচনা করে। বাংলাদেশে এখনো এ পথে কেউ হাঁটেনি। বিরোধী দল সব সময় সরকারের সমালোচনা করে। এগুলো সমালোচনার জন্য সমালোচনা। নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ নয়। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতিহীনতার জন্যই গড়ে ওঠেনি। প্রায় ৩০ বছর ধরে বিরোধী দল ধারাাহিকভাবে সংসদ বর্জন করে। এতে নজরদারি কাঠামো তৈরি হয়নি। এছাড়া দেশের স্বার্থের চেয়ে দলের নীতি প্রধান্য পায়। অথচ ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু সমালোচনার কাঠামো নয়— এটা গণতন্ত্রের বিকল্প রূপরেখা তৈরির একটি অনুশীলন মাত্র।

এখন প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশে কি ছায়া মন্ত্রিসভা প্রয়োজন? উত্তর সম্ভবত হ্যাঁ। একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্যাডো কাঠামো হলে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নীতিগত প্রতিযোগিতা বাড়বে, জবাবদিহিতা শক্তিশালী হবে এবং জনগণ যেকোনো বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাবে। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিপক্কতার দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

যতদিন ছায়া কাঠামো না হবে ততদিন কী হতে পারে? মন্ত্রী যেন একাকী হয়ে না পড়েন সেজন্য গবেষণা সেল করা যায়। রাজনৈতিক কর্মী ও সাবেক আমলাদের সমন্বয়ে এ সেল হলে তারা নীতি প্রণয়নে মন্ত্রীর অবস্থান পত্র তৈরি করতে পারবে। এতে মন্ত্রীকে আর আমলাদের পকেটে ঢুকে যেতে হবে না। শুরুর দিন থেকেই মন্ত্রীরা আমলাদের ওপর নির্ভর হয়ে পড়েন। সেই অবস্থা থেকে মন্ত্রীরা আর বের হতে পারেন না। আমলাদের প্ররোচনায় মন্ত্রীরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এক সময় যা তাদের ‘স্বৈরশাসনের’ দিকে ঝুঁকে পড়তে প্রলুব্ধ করে। তখন অবশ্য আমলারা আরও একধাপ এগিয়ে প্রবোধ দেন— ‘ভালো স্বৈরশাসক’ হিসেবে। যদিও স্বৈরশাসক কখনো ভালো হয় না। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে উন্নয়নও ধোপে টিকে না। তা সে যত উন্নয়নই হোক!

    শেয়ার করুন: