সাক্ষাৎকার
বাজেটের সঙ্গে সংস্কারের সমন্বয় ঘটানো জরুরি

ড. জাহিদ হোসেন
জাতীয় বাজেট একটি দেশের এক বছরের ভবিষ্যৎ সামগ্রিক ও আর্থিক পরিকল্পনা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার সময়টাও একটু অন্যরকম। তাই গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে চিন্তা করাটা জরুরি। বাজেটে কী কী বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে এবং কীভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে— এসব বিষয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার হামিদ-উজ-জামান।
আগামীর সময়: বর্তমান চ্যালেঞ্জিং সময়ে আগামী বাজেট কেমন হতে পারে?
ড. জাহিদ হোসেন: বাজেট তৈরির সময় গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে। প্রথমত, বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায় কম; এরপরও বেতন-ভাতাসহ কিছু অনিবার্য ব্যয় করতেই হবে এবং তৃতীয়ত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে আগে যে সামর্থ্য ছিল, যুদ্ধের পর সেটুকুও হারিয়ে গেছে।
আগামীর সময়: বৈশ্বিক সংকটের কারণে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ায় আমাদের অভিঘাত কোথায়?
ড. জাহিদ হোসেন: দেশ এখন বৈশ্বিক সংকটের সম্মুখীন। আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি, সেগুলোর গড় দাম বেড়েছে। এটি সাময়িক নয়, দীর্ঘস্থায়ী হবে। এ ছাড়া যে পরিমাণ পণ্য দরকার তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ক্রিটিক্যাল পণ্য যেমন— তেল, গ্যাস, সার ইত্যাদির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে। চাহিদা অনুযায়ী জোগান মিলছে না। এটি একটি নতুন পরিস্থিতি, যা গত অর্থবছরের বাজেট তৈরির সময়ও ছিল না। ফলে এখন নতুন করে অনেক কিছুই ভাবতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতির ধাক্কায় বিদেশ থেকে পণ্য কিনতে গেলে বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এই বেশি ব্যয় কোথাও না কোথাও, কারও না কারও ঘাড়ে চাপবে; কিন্তু এই বোঝা বহন করার শক্তি খুব বেশি কারও নেই। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা ভালো; কিন্তু প্রবৃদ্ধি কমছে, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে, ব্যাংকিং সিস্টেমে ঝামেলা এবং রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, শিক্ষকদের এমপিওসহ বেশ কিছু অনিবার্য ব্যয় করতেই হবে। এখানে ম্যানেজমেন্টটা কীভাবে হবে, তা অবশ্যই বাজেট তৈরির সময় গভীরভাবে ভাবতে হবে।
আগামীর সময়: এত পিছুটান; কিন্তু বাজেট তো দিতে হবে।
ড. জাহিদ হোসেন: সেটা তো অবশ্যই। কিন্তু বাজেট করতে গেলে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, সেটি আগে আলোচনা করা দরকার। যেমন— এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে নেওয়া যাবে না। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। এ ছাড়া ঘাটতি বাজেট সম্প্রসারণমূলক হলে অভ্যন্তরীণ বাজার বা ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলে সুদের হার অনেক বেশি হবে।
আগামীর সময়: রাজস্ব আদায় নিয়ে কিছু বলুন।
ড. জাহিদ হোসেন: রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকার বাস্তবভিত্তিক কারণ নির্ধারণ করতে হবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য সবসময় উচ্চাভিলাষী থাকে। এক্ষেত্রে বাস্তবতা আমলে নিতে হবে। করনীতির ফাঁকফোকরের কারণে করদাতাদের কাছ থেকে অনেক টাকা নেওয়া হলেও সরকার সবটা পায় না। এ ফাঁক বন্ধ করতে হবে।
আগামীর সময়: সরকার কী করতে পারে?
ড. জাহিদ হোসেন: বাজেট তৈরির সময় হিসাব করতে হবে রাজস্ব আদায় কত হবে। বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ পেতে পারি কি না এবং দেশ থেকে কতটা কম ঋণ নিলে চাপ বাড়বে না। ধরুন রাজস্ব আদায় ৫ লাখ কোটি ধরা হলো (যদিও কখনো এমন লক্ষ্য পূরণ হয়নি)। ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এলো। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা এলো। তাহলে মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা হলো। এর থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধে যাবে। তাহলে থাকে ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা থেকে সরকারি বেতন, ভাতা, পেনশন, রাস্তাঘাট মেরামত, স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, তেল, গ্যাস, সারসহ নানা খাতে ভর্তুকি দিতে হবে। বাকি টাকা দিয়ে এডিপি আকার নির্ধারণ করতে হবে। এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আগামীর সময়: তাহলে করণীয় কী?
ড. জাহিদ হোসেন: এমন কষ্টকর সময়ে কাঠামোগত সংস্কারই একমাত্র পথ। এই সংস্কার করা গেলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমানো যাবে। এদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ করে ঋণ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন বা বাণিজ্য হচ্ছে না। ঋণ দিয়ে ঋণ পরিশোধ হচ্ছে। ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে। অনেক ব্যাংক আইসিইউতে আছে। এখানে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই। আবার বন্দরে পণ্য লোড-আনলোডে অনেক বেশি সময় লাগছে। এতে শিল্পের কাঁচামাল এনে উৎপাদন বাড়ার চেয়ে হতাশাই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর পেছনের কারণ হলো— প্রক্রিয়াগত সমস্যা, বন্দরের হ্যান্ডলিং সক্ষমতার অভাব ইত্যাদি। এসব কারণ কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে শ্বাস নিতেও আইনি জটিলতা আছে। এক্ষেত্রে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে হবে।




