এই ছাড় জনগণের দোরে পৌঁছাবে তো?

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট। প্রত্যাশাও ছিল বড়। এরই প্রতিফলন দেখা গেল বাজেটে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনে জোর দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির ভয়াবহ চাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টাও লক্ষণীয়। একই সঙ্গে নিত্যপণ্য, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিতে ছাড় দেওয়াও ইতিবাচক। বাজেটের বিশেষ স্বস্তির দিক হচ্ছে নিত্যপণ্যের মূল্য কমবে। চাল, ডাল, আটা, আলু, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে করের হার আগে ৫, ২ বা ১ শতাংশ ছিল, যা এক ধাক্কায় কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে নিঃসন্দেহে এটি সরকারের বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন দেখার বিষয় ইতিমধ্যেই বাড়তি মূল্যের পণ্যগুলোর দাম বাজেট ঘোষণার পর কমে কি না। কারণ, আমাদের দেশে নানা অজুহাতে, কারণে-অকারণে মূল্যবৃদ্ধি হলেও, পণ্যমূল্য কমার নজির নেই। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে কর ছাড়ের কতটুকু সুফল মানুষের পাতে পড়বে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ছাড় দেওয়ার ফলে প্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির দ্বার উন্মোচিত হবে। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করার ফলে তরুণরা এই স্বাধীন পেশায় যুক্ত হতে আগ্রহী হবে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন খরচ কমাতে সার, কীটনাশকের আগাম কর ছাড় দেওয়ায় কৃষক উপকৃত হবেন।
স্বাস্থ্য খাতে কর ও শুল্কের ক্ষেত্রে বড় ছাড় দেওয়ার ফলে সাধারণ রোগীদের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর কর এবং ভ্যাট মওকুফ, হৃদ্যন্ত্রের রিং আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতির ফলে চিকিৎসা খাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে বলে আমরা মনে করি।
অন্যদিকে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও, তা ইউনেসকোর জিডিপির ন্যূনতম ৬ শতাংশ বরাদ্দের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক পেছনে। অবশ্য সরকার বলেছে পর্যায়ক্রমে ওই মানদণ্ডে পৌঁছানো হবে। আশা রাখি সরকার কথা রাখবে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত বরাদ্দ বাড়লেও, এখনো দেশের দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত।
বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার বাড়ানো হলেও, সেই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যোগ্যতা নিয়ে বরাবরের মতোই বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রতি বছরই দেখা যায় জিডিপি বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক হয় না, অথচ অপচয় ও আমলাতান্ত্রিক খরচ ঠিকই বাড়ে। এদিকে, বাজেট বাস্তবায়নের টাকা কোথা থেকে আসবে- সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিের্দশনাও নেই। ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে প্রবৃদ্ধির চেষ্টা শেষ পর্যন্ত দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষকে এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক জাঁতাকলে পিষ্ট করতে পারে।
বস্তুত, এ বাজেট ভারসাম্য রক্ষার বাজেট। একদিকে স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে, অন্যদিকে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রবৃদ্ধির পথ দেখাবে। এখানে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থসংস্থান। অর্থের জোগান না থাকলে সাফল্য আশা করা যায় না। সেজন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা-সততা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স জরুরি দরকার।




