পরিকল্পনার ভেজা পাতা থেকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
গণপূর্ত সচিব সমীপেষু
মহাশয়, চট্টগ্রাম থেকে এক ভাসমান নাগরিকের সালাম জানবেন। আমার এখানে এখন হাঁটুপানি, পকেটে জলসিক্ত বাস টিকিট আর চোখের সামনে গত ৩০ বছরের মহাপরিকল্পনার একখণ্ড স্মারকলিপি। আমাদের নাকি ২৫ বছর মেয়াদি নতুন মাস্টারপ্ল্যান উপহার দেওয়া হয়েছে! খবরটি পড়ে ম্যানহোলের স্যুয়ারেজমিশ্রিত পানিতে আমার আনন্দাশ্রু মিশে গেল।
কী দারুণ আপনারা! চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) গত তিন দশকে পরিকল্পনার ৮০ ভাগই বাস্তবায়ন করেনি— এই অনন্য রেকর্ড কি গিনেস বুকে পাঠানোর আবেদন করেছেন? ভেবে দেখুন, সড়ক মোড় উন্নয়নের কাজ হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ আর বাস টার্মিনাল? সাতটির জায়গায় মাত্র একটি! যে ১১টি রেলওয়ে ওভারব্রিজের স্বপ্ন আমরা ১৯৯৫ সাল থেকে দেখে আসছি, সেগুলো আজ তিন দশক পরও ভূতের মতো ভেসে বেড়ায়। এমনকি ড্যাপের চোখ ফাঁকি দিয়ে শহরের ৩৩ ভাগ কৃষিজমি যখন হাউজিং আর বাণিজ্য গিলে খেল, আপনারা তখন নিশ্চয়ই ফাইল সই করার সাধনায় মগ্ন ছিলেন। চট্টগ্রামের পরিধি বহুগুণ বাড়লেও সিডিএ চলছে সেই ১৯৮২ সালের লোহালক্কড় জনবল দিয়ে, যার অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা। কাঠামোহীন প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার মাস্টারপ্ল্যান কি শুধু ছাপানো কাগজের ওজন বাড়ানোর জন্য?
আমরা এমন অভূতপূর্ব নগরে বাস করি, যেখানে বৃষ্টি হলেই ড্রেন আর রাস্তা একাকার হয়ে যায়
আমাদের রাজধানী ঢাকা তো আরও এগিয়ে! নয়-নয়টি মাস্টারপ্ল্যান রচনা করেও ঢাকাকে আপনারা জলাবদ্ধতায় অনন্য করে চলেছেন। একদিকে রাজউকের হাজার কোটি টাকার ‘ড্যাপ’, অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির আলাদা মাস্টারপ্ল্যান— নগর সরকার না থাকলেও ‘পরিকল্পনা সরকার’ যে কত ধরনের ও কী কী, তা দুই সিটি ও রাজউকের রশি টানাটানি দেখলেই বোঝা যায়।
আমরা এমন অভূতপূর্ব নগরে বাস করি, যেখানে বৃষ্টি হলেই ড্রেন আর রাস্তা একাকার হয়ে যায়। উন্মুক্ত ম্যানহোল বা হাঁ করা নালা আমাদের জন্য সাজানো নিশ্চিত ফাঁদ আর ফ্লাইওভারের কংক্রিট আমাদের প্রতিদিনের স্থবিরতার স্মারক। ফুটপাতগুলো দখলের মহোৎসবে বিলীন, সড়কে নামলেই গণপরিবহনের অরাজক চাকা আমাদের দুমড়েমুচড়ে দেয়, নয়তো কোনো ভাঙা দেয়াল ধসে এসে আমাদের সব পরিকল্পনার সমাপ্তি ঘটায়।
তাই বলি কি, নতুন ২০২৫-৫০ মহাপরিকল্পনার ওই প্রকাণ্ড খসড়াগুলো এবার ওয়াটারপ্রুফ কাগজে ছাপাবেন। কারণ, আগামী ২৫ বছরেও যখন শহরের রাস্তায় জল জমবে, তখন যেন ভেসে যাওয়া আমরা— ম্যানহোলে ডুবে মরা নাগরিকরা অন্তত পেপার বোট বানিয়ে সেই রঙিন মাস্টারপ্ল্যান ভাসিয়ে দিতে পারি!
ইতি
পরিকল্পনায় হাবুডুবু খাওয়া এক পথচারী






