সম্পাদকীয়
যেন বুধোর ঘাড়ে না বর্তায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের একার নয়। পথচারীর দায়িত্ব আছে, রয়েছে যাত্রীরও কিছু দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব আর দায় চাপিয়ে দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় একজন পথচারী বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটলে, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হলে; কিংবা যেখানে জেব্রা ক্রসিং থাকার কথা, সেখানে না থাকলে— শুধু তাকেই অপরাধী বানানোটা ন্যায়সংগত নয়।
সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের এক কঠিন বাস্তবতা। প্রতিদিনই সড়কে প্রাণ যাচ্ছে, পঙ্গুত্ববরণ করছেন মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতি। ফলে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে স্বাগত। কিন্তু প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে যে প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেটা ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ করে যাত্রী ও পথচারীরাও শাস্তির আওতায় আসবেন— এমন বিধান বাস্তবে প্রয়োগ হলে প্রশ্ন উঠতেই পারে; সড়কের অনিয়মের দায় কি শেষ পর্যন্ত দুর্বল ও অসহায় মানুষের ঘাড়েই চাপানো হবে? অামরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, নিরীক্ষণ ও অংশীজনের পরামর্শ গ্রহণ শেষে আইনটিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংসদে পাঠানোর অাহ্বান জানাই।
আবার যাত্রীকে যদি চালকের বেপরোয়া আচরণ, অতিরিক্ত গতি কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করার দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে মূল অপরাধীর দায় তো আড়ালে থেকে যাবে। যাত্রী বাস চালায় না, গাড়ির ব্রেক পরীক্ষা করে না, ফিটনেস সনদ দেয় না, রুট পারমিটও অনুমোদন করে না। পরিবহনব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার দায় কি যাত্রীদের ওপর চাপানো যাবে?
শঙ্কার কথা হলো, আইনটি যদি দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ পড়তে পারে। এমনটি হলে নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হবে। চালক-মালিক, পরিবহন ব্যবস্থাপক, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দায় না নিয়ে শেষ পর্যন্ত সহজে শনাক্ত করা পথচারী বা যাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকলে, সেটা কালো আইনে পরিণত হবে। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মোটরসাইকেলচালক, হেলমেট ব্যবহার ও শিশু আরোহীদের সিট নিশ্চিতকরণ এবং গণপরিবহনে নারী-বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সিট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য।
প্রশ্ন হলো, শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই সড়কে নিয়মশৃঙ্খলা ফিরে আসবে— এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আইন প্রয়োগের সক্ষমতা, পুলিশের জবাবদিহি, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা, সড়কের নকশা, ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, ট্রাফিক সিগন্যাল এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা— সবকিছু একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এলে সুফল বেশি পাওয়া যাবে। না হলে যত কঠোর আইনই প্রণয়ন করা হোক, দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো থেকে যাবে আগের জায়গাতেই।
সড়কে চলাচলে ও দুর্ঘটনা রোধে নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়। ঘর কিংবা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই যদি শিশুদের এ দায়িত্ব ও নাগরিক জ্ঞান অর্জিত হয়, তবে তা সারা জীবন তার জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে কাজ করবে। এ বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রস্তাবিত আইন সংসদে চূড়ান্ত হওয়ার আগে ব্যাপক জনমত নেওয়া প্রয়োজন। পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক-যাত্রী, পথচারী-সড়ক বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ-নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করা উচিত। শাস্তির বিধান রাখতে হলে তা যেন ন্যায়সংগত, প্রয়োগযোগ্য এবং অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। লঘুপাপে গুরুদণ্ড যেন না হয়। পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কে পথচারী ও যাত্রীদের জন্য অবকাঠামোও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।






