ছয় মাসেই গ্যাস বিদ্যুতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; বরং এটি বিগত কয়েক দশক ধরে গৃহীত ভুল ও স্বার্থান্বেষী নীতিমালার এক অনিবার্য পরিণতি। এই সংকটের বীজ রোপণ করা হয়েছিল বহু বছর আগে। সমাধানের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পথ না ধরে এমন সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে মূল সুবিধাটি পেয়েছে বিদেশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং দেশের ভেতরের কিছু লুটেরা গোষ্ঠী। বিপরীতে সাধারণ জনগণের ঘাড়ে চেপেছে সীমাহীন দুর্ভোগ ও মূল্যবৃদ্ধির বোঝা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড় করানোর বদলে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং পরে জাপানের সংস্থাসহ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শে আমদানিনির্ভর ও ব্যবসায়ীবান্ধব নীতিতে রূপ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রাইভেটাইজেশনের যে ধারা শুরু হয়েছিল, ২০১০ সালের বহুল আলোচিত ‘দায়মুক্তি আইন’ পাস করার মাধ্যমে তা এক চরম ও বিপজ্জনক মাত্রা পায়। ওই আইন এবং পরে বিদেশি পরামর্শকদের প্রণীত মহাপরিকল্পনার মূল দর্শনই ছিল বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অত্যধিক ব্যয়বহুল, পরিবেশবিনাশী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলা।
তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে আমরা শুরু থেকেই আন্দোলন ও প্রচার চালিয়ে আসছি তিনটি মৌলিক নীতি সামনে রেখে। প্রথমত, আমাদের নিজস্ব সম্পদ ও প্রাকৃতিক জ্বালানির ওপর দেশের শতভাগ মালিকানা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই সম্পদ উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও ব্যবহারের জন্য জাতীয় সক্ষমতা ও নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগাতে হবে। এবং তৃতীয়ত, সীমিত সম্পদ হলেও তার সর্বোচ্চ সুষম
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে এবং পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের সময়ে আমাদের গ্যাস বিদেশি ও মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমে রপ্তানি করার এক প্রবল চক্রান্ত তৈরি হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাস, সরকার ও আমলার একাংশ এবং মিডিয়া ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত বিদেশি কোম্পানির অনুগত কর্মচারীরা সেই রপ্তানির পক্ষে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। তবে সাধারণ জনগণের তীব্র প্রতিবাদ ও গণআন্দোলনের কারণে সেই অপচেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও জ্বালানি খাতের
ইদানীং কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, জাতীয় কমিটি তেল-গ্যাস রক্ষার আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা ছিল না। এমন অভিযোগ একেবারেই অমূলক। গণসম্পৃক্ততা না থাকলে গ্যাস রপ্তানি প্রতিরোধ আন্দোলন বা ফুলবাড়ীর ঐতিহাসিক প্রতিরোধ কখনোই সফল হতো না। ফুলবাড়ীতে মেইনস্ট্রিম রাজনৈতিক দলের নেতারা কয়লা খনি করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পক্ষে থাকলেও তাদের বিপুল সংখ্যক সমর্থক ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনে অকাতরে শামিল হয়েছিলেন। আন্দোলন কোনো গোষ্ঠী বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; জনগণের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই
বিদ্যমান তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করে বা বছরের পর বছর নতুন এলএনজি টার্মিনালের পেছনে না ছুটে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব
রাজনৈতিক দলগুলোর নীতির এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত হতাশাজনক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে আমদানিনির্ভর ও লুটেরা মডেল তৈরি করা হয়েছিল, গণঅভ্যুত্থান-উত্তর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল এর আমূল পরিবর্তন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও জ্বালানি নীতিতে বিদেশি করপোরেট স্বার্থের কাছে নতি স্বীকারের ধারা বদলায়নি। এমনকি যেসব রাজনৈতিক দল বিরোধী দলে থাকতে এলএনজি আমদানি, কয়লা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তীব্র
বর্তমানে বিদ্যমান তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করে বা বছরের পর বছর নতুন এলএনজি টার্মিনালের পেছনে না ছুটে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রথমত, ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রশাসনিক ও কারিগরি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ভোলার বিপুল পরিমাণ গ্যাস পড়ে আছে অথচ তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। সরকার ছয় মাস আমদানির পিছে না ছুটে এ বিষয়ে
তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সোলার পাওয়ারের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব, যদি সদিচ্ছা থাকে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে, যেখানে আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতাই ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা মুখে বলা হলেও বাস্তবে এর উপকরণের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও কর বসিয়ে বাধা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে।
সংকট সমাধানের উপায় ও পরামর্শ চেয়ে সরকারের তরফ থেকে যে বার্তা বা আহ্বান এসেছে, তার ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে জ্বালানিমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল মহলে আমাদের প্রস্তাবনা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে আমরা সরকারের আমদানিনির্ভর মহাপরিকল্পনার বিপরীতে যে বিকল্প মহাপরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলাম, সেখানে তথ্য-উপাত্তসহ সুস্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছিল কীভাবে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুতের বিপজ্জনক পথ এড়িয়ে, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য
লেখক: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও লেখক




