বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা ডিজাস্টারের দিকে নিয়ে যাচ্ছি

প্রাথমিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা হলো ফাউন্ডেশন। আজকের ঢাকায় আমরা দেখি যেখানে-সেখানে মানুষ ময়লা ফেলছে, প্লাস্টিক ফেলছে। এই বর্জ্যগুলো ড্রেনের সাহায্যে চলে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গায়, তারপর হয়তো বঙ্গোপসাগরে। শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী আর তুরাগসহ ঢাকার চারপাশে আরও বেশ কয়েকটি নদী বয়ে গেছে। তার মানে ঢাকা ভেনিসের মতো হতে পারত। কিন্তু আমরা যেহেতু যথেষ্ট শিক্ষিত নই, তাই নদীর মর্ম বুঝি না।
এখন নদী যে বাঁচাতে হবে, পরিবেশ যে রক্ষা করতে হবে এই শিক্ষাগুলো প্রাইমারি স্কুলেই মনে গেঁথে দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ জাপানের প্রাইমারি স্কুলের কথাই বলি। জাপানের প্রাইমারি স্কুলগুলোতে শেখানো হয়, একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী গণপরিবহনে উঠলে বাকিরা কী দায়িত্ব পালন করবে। অভিনয়ের মাধ্যমে বাচ্চাদের শেখানো হয়। এ ছাড়াও একজন বৃদ্ধ মানুষ বাসে উঠলে কী করা উচিত সে বিষয়েও বাচ্চাদের শেখানো হয়। অর্থাৎ এই বয়সে কিছু শেখানো মানে সারা জীবনের জন্য মনে থেকে যাওয়া। ফলে সে পাবলিক বাসে ভাড়া নিয়ে মারামারি করবে না, মেয়েদেরকে সিট ছাড়বে কি ছাড়বে না এটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকবে না।
হাসিনা সরকার নতুন যে শিক্ষাক্রম চালু করেছিল, শুনেছিলাম ওটা নাকি ফিনল্যান্ডের আদলে তৈরি করা হয়েছিল। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম এটা ক্ষতিকর হবে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা এখানে কপি-পেস্ট করার জন্য আমাদের তো সেই স্ট্র্যাকচার ছিল না, এখনো নেই। ৫৪ বছর ধরে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বলা হচ্ছে সে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। এই শব্দটার একটা মানসিক আঘাত রয়েছে।
একজন খারাপ শিক্ষক নিয়োগ মানে ছাত্রদের সঙ্গে অন্যায় করা। এই প্রক্রিয়া প্রাথমিক শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, সব ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা উচিত
আজকালদিয়ে ছেলেমেয়েরা শুল্ক বিভাগে যেতে চায়। প্রাইমারির শিক্ষক কিন্তু প্রথমে কেউ হতে চায় না। কোনো জায়গায় চাকরি না পেলে শেষ ভরসা হিসেবে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হতে চায়। প্রাইমারি স্কুলে যারা পড়ে, তাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তান। মধ্যবিত্তদের ছেলেমেয়েরা এসব স্কুলে যায় না। ঢাকা শহরে ৩২২টা সরকারি প্রাথমিক স্কুল আছে, প্রত্যেকটা স্কুলের নিজস্ব জায়গা আছে, কিন্তু ফেলে রাখা হয়েছে। কী নিদারূণ অপচয়! প্রাথমিক শিক্ষার জায়গাটা ঠিক করতে না পারলে বাংলাদেশ ঠিক হবে না।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা স্পষ্ট ডিজাস্টারের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে আমার একটু হলেও আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর কথাবার্তা যা শুনলাম, তাতে হতাশ হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ পর্যন্ত যাদের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৩৬ পৃষ্ঠার একজন ভিসিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকে মনে করেন, এই নিয়োগ আসলে ছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ব্লু-প্রিন্ট। তার মানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একটি বিশেষ দলের দলীয় নিয়োগ তৎপরতা ছিল। আবার এখন যা হচ্ছে তাও সেই দলীয় ভিসি নিয়োগের চর্চা।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তিন-চারটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম পড়ান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে যদি প্রতিদিন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়, তবে কি তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভিস দিতে পারবেন? একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষক যদি একাধিক জায়গায় পার্টটাইম শিক্ষকতা করে বেড়ান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেন ভালো হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্ষমতা একজনের (ভিসি) কাছে ন্যস্ত। এতে সরকারের কী সুবিধা? একজনকে নিয়ন্ত্রণ করলে গোটা ইউনিভার্সিটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এরকম ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
ভিসির কাজ কী? অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ডের কোনো এক ছাত্রকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তোমার ভিসির নাম কী? বেশিরভাগ ছাত্রই বলতে পারবে না। এমনকি অনেক শিক্ষকও বলতে পারবেন না। কারণ ভিসির সঙ্গে একাডেমির সরাসরি সম্পর্ক নেই। প্রশাসনিক এবং অ্যাকাডেমিক কাজের যত ধরনের সুবিধা দরকার, গবেষণার জন্য যে কাজগুলো দরকার, ক্লাসরুম কীভাবে আরও ছাত্রবান্ধব করা যায়, এগুলো দেখা হলো ভিসির কাজ। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪টি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান হলেন ভিসি। তার এতই ক্ষমতা যে, বোর্ডে যে-ই থাকুক, তিনি যদি বলেন অমুক প্রার্থীকে আমার পছন্দ, তাহলে তার সঙ্গে দ্বিমত করার কাউকে পাওয়া যাবে না।
শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগের তিন-চারটি স্তর থাকে। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি স্তরে ফিল্টারিং হওয়ার কথা। একজন শিক্ষক নিয়োগ মানে ৩৫ বছর ধরে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করবেন। ফলে একজন খারাপ শিক্ষক নিয়োগ মানে ছাত্রদের সঙ্গে অন্যায় করা। এই প্রক্রিয়া প্রাথমিক শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, সব ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা উচিত।
আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ক্লাসে সব শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব ছিল। একটা উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বৈচিত্র্য আবশ্যক। বিশ্বের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিন্তু এটা আছে। আর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই চায় না তাদের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ুক। আজকে যদি উচ্চবিত্তের সন্তানরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত, মন্ত্রী-এমপির সন্তানরাও এখানে পড়তে আসত, তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি এই শ্রেণির মায়া থাকত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাইরে মিথস্ক্রিয়া হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইউরোপে পড়তে গিয়ে দেখেছি, লাঞ্চ টাইমে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকরা দল বেঁধে লাঞ্চ করতে যায়। এ সময়ে তারা একসাথে খাবে, নানান বিষয়ে গল্প করবে, আবার পড়াশোনাও হবে। পড়াশোনার বাইরের বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। ক্লাসরুম তো একটা গৎবাঁধা ফ্রেমের মধ্যে থাকে। কিন্তু এই লাঞ্চ আওয়ারে শিক্ষার্থীরা কোনো ফ্রেমে বাঁধা থাকে না। তারা সবকিছু নিয়ে কথা বলে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত অ্যাকাডেমিক পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে যে ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, গবেষণা নিয়ে মতবিনিময় বা নতুন জার্নাল-পাবলিকেশন নিয়ে কথাবার্তা হওয়ার কথা, তা খুব কমই দেখা যায়; বরং ব্যক্তিগত বিষয়, সম্পর্ক বা তুচ্ছ আলোচনাই বেশি প্রাধান্য পায়। আলাদা সুবিধা, আলাদা জায়গা, আলাদা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদির কথা বলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকই হলো এই সোশ্যালাইজেশন।
আরেকটা সমস্যা হলো বাংলাদেশে ফিডার কলেজ নেই। যেই মুহূর্তে ঢাকা কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ, বিএল কলেজ, বিএম কলেজসহ আরও সব ফিডার কলেজে অনার্স খুলে ফেলল, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর চরিত্র নষ্ট হয়ে গেল। পৃথিবীর কোন দেশে একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনার্স, মাস্টার্স, এইচএসসি একসঙ্গে আছে? থাকতে পারে না। আমরা ফিডার কলেজগুলোকে নষ্ট করেছি।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনেক কলেজ আছে যেখানে অনার্স পড়ানো হয়। গত ১০০ বছর ধরে কেবল অনার্সই পড়ানো হয়। যে কলেজগুলোতে অনার্স আছে, ওখানে সবার পিএইচডি আছে। আর আমাদের কলেজগুলোতে অনার্স পড়ায় বিসিএস ক্যাডার। তার মানে শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক





