তোমারে দেখিতে, নারী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে কতজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আছেন, তা নিয়ে মাঝেমধ্যে আমি চিন্তা করতে বসি। একদমই বেহুদা চিন্তা করতে বসি। এই তথ্যের কোনো গুরুত্ব আমার জীবনে নেই। ২০২৬ সালে কতজন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বসেছিলেন, কতজন পাস করেছিলেন— এসব তথ্য নিয়ে আমার যেমন মাথাব্যথা নেই, তেমনি ঠিক কতজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশে বিরাজ করেন, তা নিয়েও আমার সামান্য মাথাব্যথা ছিল না। তবে মুশকিল হচ্ছে, তারা থিওরি দেন। আরও মুশকিল হলো, সেসব থিওরি, জানামতে, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে দৈনিক সম্প্রচার করতে থাকে। লোকজন সেসব থিওরি শুনে নিজেরা জ্ঞানী হন। পরে আমি টিভি দেখি বা না দেখি, লোকেরা জ্ঞানী হয়ে সেসব থিওরি আমার সামনেও চর্চা করতে থাকেন। ফলে দীর্ঘকাল আমি মাথাব্যথা না করে থাকতে পারি না। তাই পাটিগণিতে ভালো হওয়ার কারণে আমি কখনো কখনো হিসাব করতে বসি। এতে মাথার উপকার হয়।
যদি ধরে নিই, আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল হলো ৪০টা, তাহলে এটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয় যে এদের সাপ্তাহিক সম্প্রচার ঘণ্টা হলো ৯৬০। এর মধ্যে কিছু ১০০ শতাংশ বিনোদন চ্যানেল হওয়ায় সেখানে থিওরিস্টরা যান না বলেই ধরে নেওয়া যায়। তাহলে বাকি থাকল ধরা যাক ৩০টা। এগুলোর মধ্যে আবার ১০০ শতাংশ সংবাদ চ্যানেলগুলোকে ১০০ শতাংশ রাজনৈতিক থিওরি-উপদ্রুত অঞ্চল হিসেবে দেখা যেতে পারে; কিন্তু হিসাবটা তাতে অনেক জটিল হয়ে যায়। তাই আমি একটা নিরাপদ সংখ্যা হিসাবে ২৫টা ধরে নিতে পারি। আর সেসব চ্যানেলের শুধু টক শোকেই রাজনৈতিক থিওরিস্ট বা বিশ্লেষকদের বিচরণ এলাকা হিসেবে দেখতে পারি। তো, তাতে সুবিধা হয় যে সম্ভাব্য রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের সংখ্যাটা একটু লাগামের মধ্যে আসে। ২৫ চ্যানেলে যদি দুই ঘণ্টা করে টক শো হয়, তাহলে দাঁড়াল প্রতিদিন ৫০ ঘণ্টা। সপ্তাহে তাহলে ৩৫০ ঘণ্টা। মোটামুটি এই হিসাবে আশ্বস্ত হওয়া চলে যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হলো সপ্তাহে ৩৫০ ঘণ্টা; এবং বছরে ১৮ হাজার ২০০ ঘণ্টা। এটি মোটামুটি একটি নির্ভরযোগ্য হিসাব। তো, একটি রাষ্ট্রে বার্ষিক ১৮ হাজার ঘণ্টা রাজনৈতিক বিশ্লেষক থাকাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে দেখার দরকার আছে। আমি এভাবে দেখতে অধুনা অভ্যস্ত হয়েছি। আগের মতো ‘আসে যায় না’ মুডে থাকলে এ দেখাটি কিছুতেই আমি রপ্ত করতে পারতাম না।
চব্বিশের আগস্ট উত্থানে নানান কিছু ঘটেছে। বন্ধু বিপর্যয়, আহাম্মক প্রতিপালন, বনবিড়ালকে ব্যাঘ্রভ্রম, আওয়ামী জাস্টিফায়ারদের ক্রোধ সামলানি, থিওক্রেটিক অটোক্রেটদের হুংকার অবলোকন, ভ্যাদরা শিক্ষা উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা, সেনাবাহিনীর মাখনের মতো নিরাসক্তির অভিনয়, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বেশ আউটডেটেড তথ্য হাতড়ানি! বলে শেষ করা যাবে না! কিন্তু আমি নিজের যে লাভটাকে গত কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে বড় করে দেখতে শিখেছি তা হচ্ছে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের বাহার বা বিরাজমানতা। এটা আমি আগে কখনোই ঐকিক অঙ্কের নিয়মে কষে দেখিনি। আমার এই নশ্বর কেরানি মাস্টার জীবনে এই উপলব্ধিটি না হলে একটা অজ্ঞতাসমেতই মরতে হতো; কিন্তু এই থিওরিস্টদের নিয়া আমি কী করিব? এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমার বর্তমান জীবনে বা অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
প্রধান উপদেষ্টার মাস্টারমাইন্ড তত্ত্বের নিবিড় গ্রাহক যে আওয়ামী রেজিমের চিন্তামটকা (থিংকট্যাংক), তা আপনারা এতদিনে জানেন। ইউনূস সাহেব বলেছেন ‘মাস্টারমাইন্ড’, তারাও বলছেন— ‘দেখেছ, বলেছিলাম না ষড়যন্ত্র?’ যুক্তরাষ্ট্র তো এসব ব্যাপারে কয়েক কদম এগিয়েই থাকে। ওরাও কত টাকা খরচ করেছে ‘রেজিম চেঞ্জে’, সেটিও ফলাও করে বলতে শুরু করেছে। জানামতে, এখন পর্যন্ত অন্তত চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে আমেরিকা ‘রেজিম চেঞ্জে’ তাদের অবদান হিসেবে দেখানো শুরু করেনি; কিউবারটাও না। আমার এই কথার অর্থ হারেরেরে করে এটি করবেন না যে আমি এগুলোর সঙ্গে জুলাইকে তুলনা করতে বসেছি। আমি আপনাদের আমেরিকার দাবির প্রবণতার ব্যাকরণটা লক্ষ করতে বলছি। আর বড়জোর আপনাদের শুভকামনা জানাচ্ছি, যাতে মানুষের সংক্ষোভকে পাঠ করতে আপনারা সমর্থ হোন। স্বীকার করি, এই দলের সঙ্গে ইহকালে আমি আর বিতর্কে আসতে ইচ্ছুক নই, যারা আওয়ামী রেজিমের বিরুদ্ধে সংক্ষোভকে নিছক ষড়যন্ত্র আর বৈদেশিক ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন; বোঝানোর চেষ্টা করছেন। এবং এভাবেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন।
আমি বরং আজকে আপনাদের কয়েকটা ‘নতুন’ কথা বলি। কথাগুলো আমি বলার চেষ্টা করেছি কয়েক দফা। দফায় দফায়; কিন্তু মার্কেটিংয়ে কাঁচা বলেই হোক, আমার পেঁচাইন্যা স্বভাবের কারণেই হোক— এগুলোর কোনো তেমন গ্রাহক হয়নি। আজকে তাই আমি এখানে আবার লেখ্যরূপে, মুদ্রিতভাবে তা প্রকাশ করতে চাই। যাতে আমি আমার মতামতটা পেটেন্ট করে রেখে পরে কিছু বিদ্যাজগতীয় অর্জন হাসিল করতে পারি। আমার অনেক কলিগই এই অর্জনে ব্যাকুল আছেন; আমিও শামিল হলাম। এটির নাম ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর। মানে নাম হলো ইম্প্যাক্ট, আর তার চলক হলো ফ্যাক্টর। এটি সাধারণত উচ্চমূল্য একাডেমিক পত্রিকায় করতে হয়। আমি একটি দৈনিকেই চেষ্টা করি বরং।
আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা যে অত্যন্ত কঠিন দিন কাটাচ্ছেন, এটি নতুন প্রসঙ্গ নয়। তারা যে দীর্ঘকাল ধরেই কেন্দ্রস্থ প্রশাসনের দুর্বিনীত এবং আত্মসাৎকারী আচরণের নিন্দা করে আসছিলেন, এটিও অনেকের কাছে নতুন প্রসঙ্গ নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি প্রশাসন/কেবিনেট ক্রমাগত বানাচ্ছিলেন, যারা বড় হয়ে যেন জয়ের লোকজন হয়ে উঠতে পারেন। কেউ কেউ এটিও বোঝেন যে জুলাই উত্থানের পরের পর্বে ‘আওয়ামী খেদাও’ জজবা বাস্তবে নেক্সাসটাকে রক্ষা করছে। তাহলে এটিও নতুন হলো না।
যেটি নতুন দাবি করছি, সেটি বরং বলি। জুলাই মাসে ক্যাম্পাসগুলো থেকে ছাত্রলীগের পলায়নের অন্যতম রূপকার খোদ ছাত্রলীগের নারী সদস্যরা। এই বাক্যটা আবার পড়তে পারেন। ২০১৩-১৪ পরবর্তীকালে ছাত্রলীগে নারীদের রিক্রুটমেন্ট লক্ষ করবেন। ব্যাপক ও গণহারে। এদের সিংহভাগ কিংবা নেতৃস্থানীয় পদের বাইরের যারা, জুলাই ২০২৪ আসতে আসতে পুরোপুরি সংগঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই শক্তিহীনতা ছাত্রলীগকে দখলকৃত ক্যাম্পাসগুলো থেকে খুব দ্রুত সরিয়ে ফেলে। নিজে থেকে আপনি যদি না বুঝে থাকেন, আমার বলার পর কিছু টুকরা দৃশ্য ও ঘটনা মেলাতে বসেন। দেখবেন এত কঠিন লাগছে না। কিন্তু তাদের এই ‘রিভল্টে’র কারণ কী? ‘গুড গভর্ন্যান্সের’ অভাব? মাস্তানির বিপরীতে মাদার তেরেসার মতো রাজনীতি করার আগ্রহ? মন্ত্রী-এমপি-ভুঁইফোড় নেতাদের ব্যাপক চুরি? প্রধানমন্ত্রীর তাচ্ছিল্য করে কথা বলা? নানান কিছুই হতে পারে; কিন্তু আমি একটা প্রস্তাব করতে চাই। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেক্সাসের মধ্যকার বিশালায়তন নারীবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের কারণে এই ‘বিদ্রোহ’। এটিও আমি বললাম নিছকই রাখঢাক করে। আরও বেনাকাব করে বললে, একটি সিস্টেমেটিক যৌননিগ্রহের প্রক্রিয়াকে এই নারীরা প্রতিহত করার সাহস অর্জন করেছিলেন বলেই এই স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল। এই স্ফুলিঙ্গই আদি, নাকি একটা অসন্তোষের মধ্যে এটার শক্তিবৃদ্ধি ঘটে, তা সম্পূর্ণ আরেক জিজ্ঞাসা।
হাজার হাজার সংক্ষুব্ধ ছাত্রীর অস্তিত্ব রাজনৈতিক ভাষামালায় ‘নাই’ হয়ে গেছে। বা হয়তো ১৮ হাজার ঘণ্টার কিছু সময় কেউ দিয়েও থাকতে পারেন। আমি খোঁজ নিতে পারি; কিন্তু সত্যি বললে, থিওরিস্টদের মুখস্থ ফর্মুলা আউড়ানিতে আমার কোনো আস্থা নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আগস্ট-উত্থানের দাবিদারদের মধ্যে নারীবিদ্বেষের যে ঐক্য লক্ষ করছেন, তার সঙ্গে আমার প্রস্তাবটাকে মিলিয়ে পড়তে ভুলবেন না কিন্তু। আর যদি এই পর্বে নারীবিদ্বেষী মহাঐক্যকে লক্ষ না করে থাকেন, তাহলে আপনার সঙ্গেও আমার ইহকালে আর আলাপ নেই।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





