করাঘাতের শিকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজেট তো একটি জিরো-সাম-গেম; কারও কারও কাছ থেকে নিয়ে কাউকে কাউকে দিয়ে স্থিতি শূন্য করে ফেলাই হলো বাজেট। এই আয় ও ব্যয় করতেও খরচ আছে। এ দেশে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। সে কারণে প্রায়ই ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করা হয়। আগামী অর্থবছর শেষে সরকারের দেশি-বিদেশি মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ দশমিক ৩৩ লাখ কোটি টাকা (জুন ১৫, ২০২৬, বণিক বার্তা)। কাজেই আমাদের বাজেট প্রকৃত অর্থে নেগেটিভ-সাম-গেম। এই ঋণের সুদাসল আবার আমজনতাকেই পরিশোধ করতে হবে। তাহলে কি বর্তমান বাজেটের সুখানুভূতিটা চার্বাক দর্শনের ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ থেকে আসছে?
দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি— সেটা অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় শোনা গেছে। কিন্তু তার হালফিল অবস্থার চিত্র তুলে ধরেননি। স্টক-টেকিং একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। বাজেটে সেটা মিসিং। সরকারে অনেক বিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ, ভূয়োদর্শী সমাজবিজ্ঞানী ও পেশাদার হিসাববিদ রয়েছেন। তারা যেভাবে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে বলে মনে করেছেন, সেভাবে বাজেটের আকার ও তার অর্থায়নের পথ নির্ধারণ করেছেন। দেখার বিষয়, এই বাজেট নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ ও বৃহত্তর জনজীবনের মানোন্নয়নে কী ভূমিকা রাখে।
প্রস্তাবিত বাজেটে এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৪ লাখ কোটি টাকা। আর ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৪৩ লাখ কোটি টাকা। এনবিআর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে সমর্থ হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে, তার পরিমাণ ৩ দশমিক ৮০ লাখ কোটি থেকে ৪ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা। এই এনবিআর এক বছরের মধ্যে ম্যাজিকাল দক্ষতা প্রদর্শন করে আগের বছরের অর্জনের চেয়ে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটাতে সমর্থ হবে, সেটা ভাববার কোনো কারণ নেই। ফলে পুরো বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ডেফিসিট ফিন্যান্সিং ২ দশমিক ৪৩ লাখ কোটি থেকে বেড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা হয়ে যেতে পারে। এটি হলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যেত এবং মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিটে পৌঁছে যেতে পারে। চলতি বছরের গত মে মাসে মুদ্রাস্ফীতির গড়হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠে গেছে। মজার তথ্য হলো, এখন গ্রামাঞ্চলেই মুদ্রাস্ফীতি বেশি, ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বাজেটে প্রাক্কলন রয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্যমাত্রা কি রাজস্ব সংগ্রহের পরিণতি লাভ করবে?
আসলে মুদ্রাস্ফীতিও একধরনের ট্যাক্স। এই ট্যাক্স বসাতে কোনো আইন প্রণয়নের প্রয়োজন হয় না। মুদ্রাস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব সীমিত আয়ের মানুষের ওপর বেশি অনুভূত হয়। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে; এতে দেশের দরিদ্রের হার ২০২২-এর ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে বেড়ে গেছে (June 15, The Financial Express)। দারিদ্র্যের এই উল্টো রথযাত্রার অন্যতম প্রধান কারণ দেশে চলমান প্রলম্বিত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি।
এনবিআর এখন রাজস্ব বাড়াতে করের ভিত্তি বাড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সহজ পথে একই বাঁধা গাভীর দুগ্ধ বারবার দোহন করার পদক্ষেপ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিছুদিন আগে শুনলাম অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় ৭১ হাজারের বেশি কর-নথি নিরীক্ষা করা হবে। এখন আরেক খবর দেখলাম, এক দশকের বেশি পেছনের কর-বছরের বন্ধ নথি কর কর্মকর্তারা নতুন করে খুলে পুরনো খরচ, আয়, লেনদেন, সহায়-সম্পদ যাচাই-বাছাই করে নতুন কর ধার্য করতে পারবেন।
সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ছাড়া ছয় কর-বছরের আগের কোনো নথি নতুন করে খোলার কোনো নিয়ম নেই। এ নিয়ম ভঙ্গ করে নতুন করে পুরনো নথি খোলা শুরু হলে আয় কতটুকু বাড়বে জানি না। তবে অর্থনীতি ও সমাজে অস্থিরতা যে শুরু হবে, তা বলাই বাহুল্য। সরকার নিজেই যদি তার নিয়ম ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, তবে কেউই তাকে আর বিশ্বাস করবে না।
আমাদের বাজেট প্রকৃত অর্থে নেগেটিভ-সাম-গেম। এই ঋণের সুদাসল আবার আমজনতাকেই পরিশোধ করতে হবে। তাহলে কি বর্তমান বাজেটের সুখানুভূতিটা চার্বাক দর্শনের ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ থেকে আসছে?
আরেকটি খবর হলো, এখন সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর কর্তিত ট্যাক্স আর আগের মতো চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে না। এখন ওটা এআইটি অর্থাৎ অগ্রিম কর হিসাবে গণ্য হবে। মোট আয়ের সঙ্গে ওই সুদ-আয়যুক্ত করে করদাতার জন্য প্রযোজ্য স্লাব অনুযায়ী মোট কর-দায় নির্ধারণ করা হবে। তারপর কর্তিত এআইটি সমন্বয় করে অবশিষ্ট পরিশোধযোগ্য কর-দায় নির্ধারণ করা হবে; বেশি কর্তন হয়ে গেলে তা ফেরত দেওয়া হবে। শুনতে হিসাবটা বেশ বিজ্ঞানসম্মত মনে হয়। যে দেশে মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ১০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে, আর জামানতের সুদ ধুঁক ধুঁক করছে নয়ছয়ের মধ্যে, সেখানে সরকারকে প্রদেয় আয়কর, আফগারি শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক কর, ব্যাংকের নানা ধরনের চার্জ পরিশোধ করার পর একজন সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পুঁজিপাট্টার অবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় কী দাঁড়ায়, সেটা হিসাব করে এনবিআরকে ট্যাক্সের সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করতে বলব। আর নছিমন-করিমনদের কাছ থেকে কাটা অতিরিক্ত কর তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফেরত দিয়ে আসতে বলব।
চলতি বছর করমুক্ত আয়সীমা ধরা আছে বছরে ৩ দশমিক ৫ লাখ টাকা। এটা নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন বছর আগে। এই তিন বছর গড় মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এনবিআরের সুবিবেচনায় এ সীমায় ২৫ হাজার টাকা যুক্ত করে আগামী বছরের জন্য নিম্নসীমা প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ দশমিক ৭৫ লাখ। বিনিময়ে ৫ শতাংশ করের স্লাব উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের করদাতাদের জন্য এটা হয়ে গেছে গরু মেরে জুতাদানের মতো। চলতি বছর এই আয়ের মাসিকসীমা ২৯ হাজার টাকার সামান্য বেশি। আমাদের বাড়িতে যে পার্টটাইম বুয়া কাজ করে, সে দুই ঘণ্টা করে পাঁচটি বাসায় খাটে। তার মাসিক ইনকাম ৩০ হাজার টাকা। এনবিআরের সীমা অনুযায়ী তার আয় থেকে কর কর্তনযোগ্য। প্রায় ১৮ কোটি লোকের মধ্যে টিআইএনধারী আছেন মাত্র ১ দশমিক ১৪ কোটি। এর মধ্যে সক্রিয় রিটার্নধারী আবার মাত্র ৪০ লাখ। অথচ এনবিআর ট্যাক্সের ভিত্তি বাড়াতে যারপর নেই খাবি খেয়ে যাচ্ছে।
তা ছাড়া বড় বড় বিজনেস ম্যাগনেট, অ্যাডভোকেট, ডাক্তার, প্রাইভেট হসপিটাল— যারা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আয় করেন, তারা কত টাকা ট্যাক্স দেন, সেটা আমরা জানি না। অনেকে কর-জালকে মাকড়সার জালের সঙ্গে তুলনা করে থাকে, যাতে শুধু চুনোপুঁটিরা ধরা পড়ে, আর রুই-কাতলারা জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে চুনোপুঁটিদের ধরে যেমন করের ভিত্তি বাড়াতে হবে, তেমনি রাঘববোয়ালদেরও পাকড়াও করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, লেনদেনে ডিজিটাইজেশন, নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথকীকরণ, নীতি প্রবর্তন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা আনয়ন, জবাবদিহি ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং সততা ও দক্ষতাকে পুরস্কৃতকরণ।
বিচারব্যবস্থার একটি নীতিও এক্ষেত্রে প্রযোজ্য; আদালতে সুবিচার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, সমাজে এর লহরি প্রভাব নিশ্চিত করতে সুবিচার যে করা হচ্ছে, সেটা প্রদর্শন করাও অত্যন্ত জরুরি। কর আদায়ের বেলায়ও অনুরূপ নীতি সহায়ক। একজন করদাতা যখন দেখবেন তার দেওয়া ট্যাক্সে কী কী কাজ হচ্ছে, সেগুলো তার ও প্রতিবেশীদের জীবনমানে কী ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে, তখন কর পরিশোধ করতে তার বুকের জ্বালা অনেকটাই কমে যাবে। এজন্য সরকারি সার্ভিস ডেলিভারি সিস্টেম উন্নত ও দৃশ্যমান করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে এই সার্ভিস ডেলিভারি সিস্টেম সর্বত্র দৃশ্যমান।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক
খাদ্য অধিদপ্তর ও কলামিস্ট





