ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাড়েই ‘দিব্যজ্ঞান’!

মশা মারতে নাকি কামান দাগাতে হয়! এতদিন এমন প্রবাদই শুনে এসেছি। কিন্তু বাংলাদেশের একশ্রেণির মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধি, আমলা আর সরকারি কর্মকর্তাদের মহিমা একেবারেই আলাদা। তারা মশা মারার ‘দিব্যজ্ঞান’ লাভ করতেও সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে মার্কিন মুলুকের ফ্লোরিডায় উড়াল দিতে চান। সরকারি কোষাগারের টাকা ‘পানিতে ফেলে’ এই বিদেশ ভ্রমণের ব্যারামটি অবশ্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার সেই আমলাতান্ত্রিক বিলাসের রঙিন বেলুনটি এক ঝটকায় ফুটো করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার একখানা লোভনীয় প্রস্তাব গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। উদ্দেশ্য অতি মহৎ— ফ্লোরিডায় গিয়ে মশক নিধনের ‘Innovative কার্যক্রম’ বা উদ্ভাবনী জাদুদণ্ড সশরীরে দেখে আসা। কিন্তু ফাইলে সই করা তো দূর অস্ত, প্রধানমন্ত্রী নথির গায়ে যে চিরকুট লিখে ফেরত পাঠিয়েছেন, তা এককথায় রাজকীয় চাবুক। তিনি সাফ জানিয়েছেন, মশা মারা শিখতে ফ্লোরিডায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; দেশের মানুষ যেভাবে মশার অত্যাচারে জর্জরিত হচ্ছে, সেখানে সন্ধ্যার পর দেশের যেকোনো একটি ডোবার পাশে দু-তিন ঘণ্টা ঠায় বসে থাকলেই মশক নিধনের ঢের উদ্ভাবনী উপায় মাথা থেকে বেরিয়ে আসবে!
প্রধানমন্ত্রীর এ মন্তব্য কেবলই একচিলতে রসিকতা, স্যাটায়ার কিংবা নিছক রঙ্গব্যঙ্গ ভাবলে মস্ত বড় ভুল হবে। এটি আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার এক কঠোর, নিপুণ এবং নির্মম প্রশাসনিক বার্তা। বিশেষ করে মেয়র শাহাদাত যখন প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত বৃত্তের মানুষ হিসেবে পরিচিত, তখন তার ক্ষেত্রে এমন কড়া সিদ্ধান্তের বিষয়টি বাকি ‘ভিআইপি’দের জন্য এক মস্ত বড় আমলযোগ্য দাওয়াই। প্রশাসনিক অন্দরমহলে ও ক্ষমতার অলিগলিতে বসে যারা দিনরাত ‘আমি কি হনুরে’ ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়ান, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রমোদ ভ্রমণের ধান্দা খোঁজেন, এই চাবুক মূলত তাদের পিঠেই সপাটে পড়েছে। দেশের সাধারণ জনতাও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা এসব সুযোগসন্ধানীর জন্য এমন এক ‘থেরাপি’র অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছিল। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, প্রশিক্ষণ কিংবা ‘প্রাক-ভিজিট’ বা স্টাডি ট্যুর— বাহারি নামের মোড়কে সরকারি টাকায় বিদেশে এই যে ‘ঝান্ডু বাম’ লাগানোর প্রক্রিয়া শুরু হলো, তা জারি না রাখলে ক্ষমতার মধুচক্রে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের বিবেচনায় কোনোদিনই সোজা হওয়ার পাত্র নন।
ফ্লোরিডা সফর প্রস্তাবনা নাকচ করে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য শুধু একটি সফর বাতিলের সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আসলে বিদ্যমান প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি প্রতীকী ও তীব্র সমালোচনা
ফ্লোরিডা সফর প্রস্তাবনা নাকচ করে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য শুধু একটি সফর বাতিলের সাধারণ ঘটনা নয়; এটি আসলে বিদ্যমান প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি প্রতীকী ও তীব্র সমালোচনা। মাঠপর্যায়ের নিরেট বাস্তবতা বোঝা, স্থানীয় উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি কানাকড়ির জবাবদিহি নিশ্চিত করার বার্তাই এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
মশার কামড় কেমন, এর বিষ কতখানি এবং কীভাবে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে— তা বুঝতে ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকতের মিষ্টি হাওয়া খাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের আনাচ-কানাচে উপচে পড়া ডাস্টবিন, অপরিকল্পিত নর্দমা, জলাবদ্ধতা আর জ্যান্ত ডোবাগুলোর দিকে তাকালেই সে নির্মম সত্য চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে।
অবশ্যই সব বিদেশ সফরকে ঢালাওভাবে এক কাতারে ফেলা যাবে না এবং সেটা করা সমীচীনও হবে না। কিন্তু একটি সফরের প্রয়োজনীয়তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের আগে নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা উচিত। যেমন— এই সফর শেষে দেশ আদতে কী অর্জন করবে? অর্জিত সেই জ্ঞান কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে? এর বিকল্প কোনো স্থানীয় গবেষণা বা অনলাইন মাধ্যম কি আসলেই নেই? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এর জন্য জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক?
বাস্তবতা বড়ই অদ্ভুত ও কৌতুকপূর্ণ। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ ঘুরে আসার ঠিক দু-এক মাসের মাথায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হয়তো অবসরে গেলেন; কিংবা তার বদলি হয়ে গেল সম্পূর্ণ অন্য কোনো দপ্তরে, যার সঙ্গে ওই সফরের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।
আজ সারা বিশ্বে প্রযুক্তির জয়জয়কার। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম এখন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কভিড মহামারী গোটা বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— হাজার কোটি টাকা খরচ করে সশরীরে হাজির না হয়েও ভার্চুয়াল মাধ্যম, আন্তর্জাতিক সেমিনার বা দূরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যমে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ ও কার্যকর জ্ঞান বিনিময় সম্ভব। সেক্ষেত্রে বিদেশ সফরকে সবসময় সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
যখন দেশের সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম শুনে ঘামছেন, নাগরিক সেবা পেতে হন্যে হয়ে ঘুরছেন, তখন কর্তাব্যক্তিদের এমন ঘন ঘন বিলাসী বিদেশযাত্রা জনমানসে তীব্র ক্ষোভ ও খারাপ অনুভূতির জন্ম দেয়। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অতীতের সরকারও কভিডের মন্দার সময় প্রজ্ঞাপন জারি করে এমন বিদেশ সফর আটকানোর এক ধরনের নাটক করেছিল; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচের গোলকধাঁধায় সে নিষেধাজ্ঞা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সুযোগসন্ধানী চক্র ঠিকই ফাইলের ফাঁকফোকর দিয়ে বিদেশ যাওয়ার ছিদ্র তৈরি করে নিয়েছিল। তবে এবার হাওয়া বদলাচ্ছে। ‘বদলে যাওয়া বাংলাদেশে’র প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তা বজায় রাখাটা এখন সময়ের দাবি। যেকোনো বিদেশ সফরের আগে বাধ্যতামূলক ‘ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ’ এবং সফর শেষে আমলাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কঠোর আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
আপাতদৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রীর ‘ডোবার পাশে বসার’ নিদানটি চুটকি বা হাস্যরসাত্মক মনে হতে পারে; কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা অনেক গভীরে।
লেখক: ক্রাইম অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন অ্যাফেয়ার্স এডিটর, দৈনিক আগামীর সময়




