দুর্ভাবনাও কম নয় বড় বাজেটে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতি বছর বাজেট বড় হচ্ছে, এবারও তাই হলো। ঘোষিত হলো ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট এবং বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে এই বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা ও আশঙ্কা দুটোই ছিল জনগণের মধ্যে। বাজেট কেমন হলো তা নিয়ে বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা চলবে এ মাস জুড়েই কিন্তু প্রথম দেখায় কেমন লাগল বাজেট? এই প্রশ্নের কিছু উত্তর খোঁজা দরকার। বাজেট পুরোটাই অর্থ আর অর্থের হিসাব হিসেবে অঙ্কের মারপ্যাঁচ। এর ব্যাখ্যা করা কঠিন হলেও এর প্রভাব জনজীবনে প্রত্যক্ষ এবং সহজ। সে কারণেই বাজেটের লক্ষ্য কী সেই আলোচনা খুবই দরকার। টাকা আসবে কীভাবে আর খরচ হবে কোথায় এই আলোচনা পুরোটাই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে বাজেট ব্যাখ্যা করার সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের রাজনীতি নিয়েও আলোচনা করা দরকার।
বাজেটের আগে দুটো ভালো খবর জানা গেল। দেশের জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার পেরিয়েছে। টাকার অঙ্কে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকার বেশি। এই আয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২৫১ ডলার বা ৩০ হাজার ৬০০ টাকা বেশি। এই হিসাব সরকারি সংস্থা বিবিএস কর্তৃক প্রণীত। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে এই যে গড় মাথাপিছু আয়ের মধ্যে কারা আছেন? কত শতাংশ মানুষ গড় আয়ের নিচে আয় করেন এবং কত শতাংশ মানুষ গড় আয়ের চেয়ে বেশি আয় করেন? দেশের ৭ কোটি ৬০ লাখ শ্রমজীবী যাদের কারওই মাসিক পারিবারিক আয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা তো দূরের কথা এর কাছাকাছিও নয়। ২ কোটি ৯০ লাখ কৃষকের আয়ের ধারেকাছেও নয়। ২৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন যারা তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আয় করলেও মাথাপিছু আয়ের সমান আয় করতে পারবেন না। তাহলে দেশে সামান্য কিছু অসামান্য মানুষ আছেন যাদের আয় এতটা আকাশচুম্বী যে তাদের সঙ্গে গড় করে মাথাপিছু আয় এই পরিমাণ হয়েছে। বৈষম্য বুঝতে তাই গিনি সহ লাগবে না, মাথাপিছু আয়ের পরিমাণের পার্থক্য দেখলেই বুঝতে অসুবিধা হবে না।
১৯ বছর আগে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী ৬৯ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। আর এবার ৫৪তম বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। তবে বাজেটের আকার ১৩ গুণ বাড়লেও জিডিপির সঙ্গে অনুপাত কিন্তু খুব বেশি বাড়েনি। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল জিডিপির ১২.৬৮ শতাংশ আর এবার তা দাঁড়িয়েছে ১৩.০৬ শতাংশ। ফলে বিষয়টা উদ্বেগজনক। বাজেট বড় হচ্ছে কিন্তু সরকারের আর্থিক সক্ষমতা তেমন বাড়ছে না। এই অনুপাতটা বিবেচনায় রেখে শুধু বড় বাজেট হয়েছে এই তৃপ্তি নয়, সক্ষমতা না বাড়ানোর কারণগুলো খুঁজতে হবে। দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে যার পরিমাণ ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট প্রদত্ত ঋণের ৩০ ভাগেরও বেশি (যদিও পুনঃতফসিলিকরণের পর তা ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে— এটা আরও বিপজ্জনক)। দুর্বল রাজস্ব আদায়, যত বেশি ধনী তত বেশি কর ফাঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কতটা কঠিন- এসব বিষয় ভাবনায় রাখতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল কেন? বৈষম্যের বেদনা বেশিরভাগ মানুষকে স্পর্শ করেছিল বলে। ফলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে, বাজেটে আয় বাড়ানো এবং ব্যয়ের খাত নির্ধারণে তার প্রতিফলন থাকবে। ধনীদের আয় বেশি ফলে তাদের ট্যাক্স বেশি, ধনীরা ভোগ বেশি করে ফলে তাদের দায় নিতে হবে বেশি এটা হওয়া উচিত করনীতি। ব্যয়ের খাতও সেভাবে চমক সৃষ্টি নয় জনগণের প্রয়োজন এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মাথায় রেখে নির্ধারণ করা দরকার।
ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে চাপমুক্ত অর্থনীতি, কৃষি আধুনিকায়ন ও কৃষক সহায়ক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ এবং তার যথাযথ ব্যবহার, শিক্ষা বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তানের জন্য মানসম্মত শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো দরকার ছিল।
কৃষক তার ফসলের দাম পায় না, শিক্ষার ব্যয় অত্যধিক বেড়েছে, চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে ঋণ করে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বাজেটে এই তিন খাত তেমন গুরুত্ব পেল না
কিন্তু সংখ্যায় বাড়লেও শতাংশে বাড়ল না। দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা না কমার তিনটি প্রধান কারণ। কৃষক তার ফসলের দাম পায় না আবার কৃষি উপকরণের দাম বেশি, শিক্ষার ব্যয় অত্যধিক বেড়েছে ফলে তা নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ আর চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ করে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বাজেটে এই তিন খাত তেমন গুরুত্ব পেল না।
বাজেটের ভালো দিক কি নেই? হার্টের রিং, চোখের লেন্স, কিডনি চিকিৎসার সরঞ্জামে শুল্ক কমেছে, ওষুধশিল্পের কাঁচামালে শুল্ক কমেছে, সোনার গয়না, বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক কমেছে, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্স সেবার ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার হয়েছে। কিছু মানুষ এগুলোর সুফল পাবেন এবং তার প্রভাব সমাজে পড়বে। কিন্তু সাধারণ মানুষের চাওয়া হাসপাতালে ওষুধ এবং চিকিৎসাপ্রাপ্তি। ডিজিটাল সেক্টরে কর্মসংস্থান ভালো কিন্তু ভাবতে হবে তা কতটুকু স্থায়ী হবে এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ থাকবে কি না আর বিদেশের দিকে তাকিয়ে কর্মসংস্থান এবং বেকার সমস্যা সমাধানের সম্পর্ক কতটা নিবিড় হবে, শেষে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে না তো?
করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি যদি সরকারি হিসাবে ৯.৪২ শতাংশ হয় তাহলে এই বৃদ্ধি তেমন স্বস্তি দেবে না। জিডিপির সঙ্গে করের হার বাংলাদেশে সবচেয়ে কম। ধনীদের ওপর করের হার না বাড়িয়ে সত্যিকারের আয় বাড়ানো কি সম্ভব? রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপগুলো কী হবে, সেসব কি জনবান্ধব হবে? ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, খেলাপি ঋণ উদ্ধারের পথ কী হবে? ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পাঁচটি দেউলিয়া ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলা হয়েছে কিন্তু তার দৃশ্যমান ফলাফল কী? পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যাংক মুক্ত করার ঘোষণা কি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার ওপরই নির্ভর করছে অনেক কিছু। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা আর মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণার সঙ্গে একমত হবেন সবাই কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে এই হার অর্জন করা কত কঠিন।
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব আছে বাজেটে। এ বছর ঋণের সুদ বাবদ শোধ দিতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা বাজেটের সবচেয়ে বড় খাত। এই তথ্যগুলো মাথায় রেখে বাজেট প্রস্তাবনা এবং বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে নতুন আশার কথা শুনিয়ে পুরনো পথেই হাঁটবে সরকার।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক



