ব্যাংক খাতের দুর্বলতা হিসাবনিকাশের সমস্যা নয়

বাংলাদেশের আর্থিক খাত এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ব্যাংকনির্ভর। দেশের পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস এখনো প্রত্যাশিত গভীরতা অর্জন না করায় সঞ্চয় সংগ্রহ, বিনিয়োগ অর্থায়ন, আমদানি-রপ্তানি সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে ঋণপ্রবাহ, সরকারি অর্থায়ন এবং মুদ্রানীতির সঞ্চালন— সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শুধু কিছু ব্যাংকের হিসাব-নিকাশের সমস্যা নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ব্যাংক অবস্থার সবচেয়ে স্পষ্ট সূচক হলো খেলাপি ঋণ। তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ৩৫.৭ শতাংশে পৌঁছে এবং ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা কিছুটা কমে ৩০.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। এই হ্রাস আংশিকভাবে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এটিকে স্থায়ী আরোগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টাকার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে; একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (SDF) হার কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয়েছে, যাতে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিষ্ক্রিয়ভাবে না রেখে আন্তঃব্যাংক বাজার ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু উচ্চ ঋণখেলাপি, প্রভিশন ঘাটতি ও ঝুঁকি-ভীত ব্যাংকিং আচরণ থাকলে মুদ্রানীতির সঞ্চালন দুর্বল হয়। সুদের হার সংকেত দিলেও ব্যাংক যদি ব্যালান্সশিট মেরামতে ব্যস্ত থাকে বা ভালো ঋণগ্রহীতাকেও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিক থেকে সাম্প্রতিক উন্নতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। রেমিট্যান্স প্রবাহ, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেট ক্রয়ের ফলে রিজার্ভ পুনর্গঠনের প্রবণতা দেখা গেছে। তবে রিজার্ভের উন্নতি স্থায়ী করতে হলে আমদানি দায় মেটানো, রপ্তানি বৈচিত্র্য, রেমিট্যান্স চ্যানেলের আনুষ্ঠানিকীকরণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আন্ডার ইনভয়েসিং বা ওভার ইনভয়েসিংয়ের মতো বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্যাংকের কমপ্লায়েন্স শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বৈদেশিক খাতেও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে ব্যাংক লাইসেন্স, সুপারভিশন, এনফোর্সমেন্ট, মার্জার, রেজল্যুশন এবং ফিট অ্যান্ড প্রোপার অ্যাসেসমেন্ট পরিপালন করতে হবে
বিদেশি প্রতিনিধি ব্যাংক, এলসি নিশ্চিতকরণ, বাণিজ্য অর্থায়ন ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা— সবই ব্যাংকের সুনামের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংকিং অটোমেশন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় ঝুঁকি। ডিজিটাল সেবায় ভুল কেওয়াইসি (KYC), দুর্বল এপিআই নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ অপব্যবহার, ফিশিং ডেটা লিংকেজ বা সিস্টেম ডাউনটাইম ব্যাংকের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই অটোমেশনের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত নিরাপদ, ইন্টারঅপারেবল, নিরীক্ষাবান্ধব এবং তথ্য-উপাত্তভিত্তিক। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সাম্প্রতিক সংস্কার কর্মসূচি এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো, আমানত সুরক্ষা আইন, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, রিস্ক বেজড সুপারভিশন (RBS), মালিকানা স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, ডিভিডেন্ড ও বোনাস প্রদানে প্রভিশন বা মূলধন শর্ত এবং আর্থিক খাতের সুশাসন জোরদারের পদক্ষেপগুলো প্রয়োজনীয়। তবে সংস্কার কর্মসূচি যথেষ্ট কি না, সেটি নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। শুধু সার্কুলার, অধ্যাদেশ বা নতুন সুপারভাইজরি কাঠামো দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, যদি এনফোর্সমেন্ট সিলেকটিভ হয়, যদি রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঋণগ্রহীতা সুবিধা পায়, যদি দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ দায়মুক্ত থাকে অথবা যদি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে আলাদা মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়। এখানেই বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে ব্যাংক লাইসেন্স, সুপারভিশন, এনফোর্সমেন্ট, মার্জার, রেজল্যুশন এবং ফিট অ্যান্ড প্রোপার অ্যাসেসমেন্ট পরিপালন করতে হবে। তবে স্বায়ত্তশাসন মানে জবাবদিহির অনুপস্থিতি নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া, তদারকি পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ, প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা, ব্যাংকিং উপাত্ত প্রকাশ এবং নীতি যোগাযোগ আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। ব্যাংক খাতকে টেকসই করতে হলে বোর্ড মেম্বার নিয়োগে ফিট অ্যান্ড প্রোপার ক্রাইটেরিয়া, ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টরের প্রকৃত ভূমিকা, ইন্টারনাল অডিটের স্বাধীনতা, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির ক্ষমতা এবং এক্সটার্নাল অডিটের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। আরবিএস ব্যাংককে কেবল অতীতের কমপ্লায়েন্স দিয়ে নয়, ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে; আইএফআরএস ৯ সম্ভাব্য ক্ষতি আগেভাগে স্বীকার করে প্রভিশন তৈরি করতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া এগুলো একা ব্যাংক খাতের সমস্যা সরাতে পারবে না। যদি ঋণ আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, যদি পুনঃতফসিল রাজনৈতিক সুবিধা হয়ে দাঁড়ায় অথবা যদি দুর্বল ব্যাংককে বারবার তারল্য সহায়তা দিয়ে প্রকৃত ক্ষতি গোপন রাখা হয়, তাহলে আরবিএস এবং আইএফআরএস ৯ কাগজে থাকবে, বাস্তব পরিবর্তন আসবে না। একদিকে দুর্বল ব্যাংকে পুনর্গঠন, মূলধন জোগান ও দায় নির্ধারণ করতে হবে; অন্যদিকে ভালো ব্যাংককে কৃষি, সিএমএসএমই, রপ্তানি, সবুজ অর্থায়ন, নারী উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে ঋণ দিতে হবে। কিন্তু ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নামে আবার দুর্বল ঋণ সংস্কৃতিতে ফিরে গেলে ভবিষ্যতের ঋণখেলাপি আরও বড় হবে। আগামী দিনের পথনির্দেশ হতে পারে কয়েকটি নীতিতে। পূর্ণাঙ্গ একিউআর (AQR) করে ব্যাংকভিত্তিক আদায়, পুনঃমূলধনীকরণ, মার্জার বা রেজল্যুশন প্ল্যান নির্ধারণ করা; দ্বিতীয়ত, ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, প্রভিশনিং, জামানত মূল্যায়ন, গোষ্ঠীভিত্তিক ঋণগ্রহীতা এক্সপোজার এবং বৃহৎ তদারকিতে তথ্যভিত্তিক কঠোরতা আনয়ন; তৃতীয়ত, ব্যাংক মালিকানা ও পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাগত সুশাসন নিশ্চিত করা; চতুর্থত, দ্রত ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ডিজিটাল কেস ট্রেকিং, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) এবং কোল্যাটারাল এনফোর্সমেন্ট রিফর্ম দরকার; পঞ্চমত, ব্যাংকিং অটোমেশনকে সাইবার সিকিউরিটি, এএমএল/সিএফটি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও সুপারভাইজরি টেকনোলজির সঙ্গে যুক্ত করা এবং ষষ্ঠত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা আইনগত ও কার্যকর উভয় অর্থেই শক্তিশালী করতে হবে, তবে তার সঙ্গে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সমস্যার গভীরতা অস্বীকার করার সময় শেষ; একই সঙ্গে সংস্কারের সুযোগও এখন সবচেয়ে বেশি।
লেখক : মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)




