পরিবারে নারীর আর্থিক জোগানে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল তুলনামূলক সরল। পরিবারের প্রধান উপার্জন করতেন। তার আয় থেকেই অন্যদের জন্য ব্যয় হতো। সময় বদলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বেড়েছে, বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে নারীও শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে এসে আয় করছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পরিবারের ব্যয়নির্বাহে একজন উপার্জনকারী নারীর ভূমিকা কী হতে পারে? ইসলাম কি তাকে সংসারের খরচ বহনে বাধ্য করেছে, নাকি সে স্বেচ্ছায় এতে অংশ নিতে পারে?
ইসলামের অবস্থান এখানে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলামের অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বিধানের দিকে তাকালে দেখা যায়, নারীকে পরিবারের ভরণপোষণের মৌলিক দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এই দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘পুরুষরা নারীদের দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের একের ওপর অন্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, যেহেতু তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৪) আয়াতের ‘তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে’ অংশটি পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের একটি মৌলিক দিক নির্দেশ করে। স্ত্রী উপার্জন করুন বা না করুন, তার মৌলিক ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর।
সন্তানের ক্ষেত্রেও কোরআন পিতার আর্থিক দায়িত্বের কথা স্পষ্ট করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৩) অর্থাৎ সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো স্ত্রীর ওপর আরোপিত কোনো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব নয়। এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান সমাজে অনেক সময় স্ত্রী উপার্জন করলেই ধরে নেওয়া হয়, সংসারের ব্যয় বহন করাও তার কর্তব্য। ইসলামি দৃষ্টিতে এমন দাবি সঠিক নয়।
তবে ইসলাম নারীকে অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়ও রাখেনি; বরং নারীকে তার সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা দিয়ে বলা হয়েছে, ‘পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জনের অংশ এবং নারীদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জনের অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩২) নারীর উপার্জন তার নিজের সম্পদ। স্ত্রী উপার্জনের অর্থ নিজের ইচ্ছামতো বৈধ কাজে ব্যয় করতে পারবেন।
এখানেই ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য প্রকাশ পায়। ইসলাম একদিকে নারীকে পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের ভারে বাধ্য করেনি, অন্যদিকে তার উপার্জনের পথও বন্ধ করেনি। নারীরা প্রয়োজন, যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বৈধভাবে উপার্জন করতে পারবেন। তবে তার কর্মক্ষেত্রে শালীনতা, নিরাপত্তা, পর্দার বিধান অটুট থাকা জরুরি।
ইসলাম যেমন নারীকে পরিবারের অর্থনৈতিক বোঝা বহনের জন্য বাধ্য করেনি, তেমনি তাকে বৈধভাবে উপার্জনের পথও বন্ধ করেনি
ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীদের জীবনেও এর বাস্তব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার ব্যবসায়িক কাফেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ইসলামের সূচনালগ্নে খাদিজা (রা.) নিজ সম্পদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মক্কার সামাজিক বয়কট ও দাওয়াতের কঠিন সময়ে তার সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠেছিল।
হজরত জায়নাব (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী। তিনি নিজ হাতে কাজ করে উপার্জন করতেন। নিজের উপার্জন থেকে স্বামী ও তার তত্ত্বাবধানে থাকা এতিমদের জন্য ব্যয় করতেন। এ নিয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি তার ব্যয়কে সওয়াবের কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি আমার স্বামী ও আমার তত্ত্বাবধানে থাকা এতিমদের ওপর ব্যয় করলে সাদাকার সওয়াব পাব?’ নবী (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, তার জন্য দুটি সওয়াব রয়েছে: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার সওয়াব ও সাদাকার সওয়াব।’ (বুখারি, হাদিস: ১৪৬৬)
এই হাদিস বর্তমান সময়ের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে একজন নারী নিজের উপার্জন থেকে পরিবারের ব্যয়ে অংশ নিচ্ছেন। নবীজি তার স্বেচ্ছায় করা ব্যয়কে সাদাকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মর্যাদা দিয়েছেন। কাজেই একজন নারী স্বেচ্ছায় সংসারের জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারেন, স্বামীকে সহযোগিতা করতে পারেন, সন্তানের শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন। কিন্তু তার এই সহযোগিতাকে অধিকার হিসেবে দাবি করা যাবে না। কারণ, ইসলাম যে দায়িত্ব স্বামীর ওপর দিয়েছে, স্ত্রী উপার্জন শুরু করলেই সেই দায়িত্ব স্বামীর কাছ থেকে সরে যায় না।
ওপরের হাদিসের বার্তা বর্তমান বাস্তবতায়ও পারিবারিক জীবনে ভারসাম্য এনে দিতে পারে। স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করবেন, স্ত্রীও নিজের আয় থেকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করতে পারেন।
একজন উপার্জনকারী নারী যদি বর্তমানের ব্যয়বহুল সময়ে স্বামী-সন্তানের প্রয়োজন বিবেচনা করে নিজের ইচ্ছায় সংসারের ব্যয়ে অংশ নেন, তা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু অনুমোদিতই নয়; সঠিক নিয়ত থাকলে এটি সওয়াবের কাজও হতে পারে।
তবে এই সহযোগিতার সঙ্গে যেন নারীর সম্পদের স্বাধীনতা নষ্ট না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। স্ত্রী উপার্জন করেন বলে তার পুরো বেতন স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে কিংবা তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সংসারের সব খরচ বহন করতে হবে, এমন কোনো বিধান ইসলামে নেই।
তাই দায়িত্ব নিয়ে পরস্পরকে প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে সহযোগী হিসেবে দেখা উচিত। স্বামী তার দায়িত্ব পালন করবেন, স্ত্রী তার সামর্থ্য ও ইচ্ছা অনুযায়ী সহযোগিতা করবেন। স্ত্রী যদি উপার্জন না করেন, তবু সন্তান প্রতিপালন, ঘর পরিচালনা ও পরিবারের মানসিক স্থিতি রক্ষায় তার অবদান অমূল্য। আর তিনি যদি উপার্জন করেন, সেই অর্থ তার নিজস্ব অধিকার। তবে ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে তার একটি অংশ পরিবারের জন্য ব্যয় করলে সেটি হতে হবে মহৎ সহযোগিতা ও সওয়াবের কাজ।
মোটকথা, ইসলাম যেমন নারীকে পরিবারের অর্থনৈতিক বোঝা বহনের জন্য বাধ্য করেনি, তেমনি তাকে বৈধভাবে উপার্জনের পথও বন্ধ করেনি। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, সেখানে দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে, আবার ভালোবাসা ও সহযোগিতার দরজাটিও উন্মুক্ত রয়েছে। তাই সংসার শুধু একজনের কাঁধে চাপানো বোঝা না হয়ে হতে পারে দায়িত্বশীলতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা একটি যৌথ আশ্রয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






