কেন জনগণ কর দিতে অনাগ্রহী

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। একটি দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজের একটি বড় অংশ কর দিতে আগ্রহী নয়। এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়; বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, জবাবদিহির অভাব এবং রাষ্ট্রীয় সেবার নিম্নমানও বড় ভূমিকা রাখছে।
ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোয় কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলক বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো— সেখানে জনগণ অন্তত কিছুটা বিশ্বাস করে যে, তাদের করের অর্থ উন্নয়ন, অবকাঠামো ও নাগরিক সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে করদাতাদের মধ্যে একটি বড় প্রশ্ন দিনদিন প্রবল হচ্ছে— ‘আমরা কর দিচ্ছি, কিন্তু বিনিময়ে কী পাচ্ছি?’
বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীরা নানা কারণে কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। প্রথমত, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে মানুষ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পায় না, শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, ভূমি অফিস, পরিবহন কিংবা অন্যান্য নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, দেশে আইনের শাসনের দুর্বলতা জনগণের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। বহু বড় বড় দুর্নীতি কিংবা আর্থিক কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু বিচার হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা, ব্যাংক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, শেয়ার কেলেঙ্কারি, বিদেশে অর্থ পাচার— এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের করব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের হার অত্যন্ত বেশি। ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন ধরনের পরোক্ষ করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ে। বর্তমানে মোট রাজস্বের বড় অংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে। অন্যদিকে উচ্চ আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর প্রত্যক্ষ কর আরোপ এখনো সীমিত। চতুর্থত, বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। পঞ্চমত, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব ব্যবসায়ী সমাজকে হতাশ করে তুলেছে। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, জটিল নিয়মকানুন, প্রশাসনিক হয়রানি, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং দুর্বল আইনি সুরক্ষা ব্যবসায়িক আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ কমছে এবং করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে শুধু করের হার বাড়ালেই হবে না; বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
জনগণ তখনই কর দিতে উৎসাহিত হবে, যখন তারা দেখবে তাদের অর্থ দিয়ে উন্নত রাস্তা, মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ নাগরিক জীবন নিশ্চিত হচ্ছে। করদাতারা যদি বাস্তব উন্নয়নের সুফল অনুভব করেন, তাহলে স্বতঃস্ফূর্ত কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
মানুষ শুধু করের হার দেখে কর দিতে নিরুৎসাহিত হয় না; তারা নিরুৎসাহিত হয়, যখন দেখে কর দেওয়ার পরও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা করে মূল্য দিতে হচ্ছে
বড় দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ব্যাংক লুটপাটের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কর-সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যারা রাষ্ট্রের অর্থ লুট করে বিদেশে পাচার করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে পরোক্ষ করনির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করভিত্তিক অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। উচ্চ আয়, অপ্রদর্শিত সম্পদ ও বিলাসী ব্যয়ের ওপর কার্যকর কর আরোপ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের জন্য করব্যবস্থা সহজ ও সহনীয় করতে হবে। দেশে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা এখনো করব্যবস্থার বাইরে। ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, ব্যাংকিং তথ্য, সম্পদ নিবন্ধন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।
যে অর্থনীতি বিনিয়োগবান্ধব নয়, সেখানে রাজস্বও টেকসইভাবে বাড়ে না। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, শিল্পায়ন বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নীতির স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমানো জরুরি।
অনেক দেশে করদাতারা বিশেষ নাগরিক সুবিধা, দ্রুত সেবা কিংবা সামাজিক মর্যাদা পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশেও সৎ করদাতাদের জন্য সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার, সহজ ব্যাংকিং সুবিধা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা ইত্যাদি চালু করা যেতে পারে। এতে কর প্রদানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ শুধু করই দেয় না, বরং দুর্বল সরকারি সেবার কারণে ‘অদৃশ্য অতিরিক্ত কর’ বহন করে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন, ইউটিলিটি, ভূমি অফিস, পাসপোর্ট, আইনশৃঙ্খলা— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্বল সেবা ও দুর্নীতির কারণে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে বছরে বিপুল অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
অথচ যদি সরকার মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত সরকারি শিক্ষা, নিরাপদ ও আধুনিক গণপরিবহন, ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারি সেবা এবং আইনের সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে জনগণের এই অতিরিক্ত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এতে মানুষের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে এবং কর প্রদানের প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।
বাস্তবতা হলো, মানুষ শুধু করের হার দেখে কর দিতে নিরুৎসাহিত হয় না; তারা নিরুৎসাহিত হয়, যখন দেখে কর দেওয়ার পরও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা করে মূল্য দিতে হচ্ছে।
লেখক: সাবেক ব্যাংকার; চেয়ারম্যান, ভার্সেটাইল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড






