আগামীর সময়

যুদ্ধ ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ইরান

যুদ্ধ ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ইরান

আলী লারিজানি। ছবি: সংগৃহীত

জানুয়ারির শুরুতে দেশজুড়ে এক ভয়াবহ বিক্ষোভের মুখোমুখি হয় ইরান। এই বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ তুলে দেশটিতে হামলার হুমকি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।


সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশ পরিচালনার জন্য একজন বিশ্বস্ত এবং অনুগত লেফটেন্যান্টের দ্বারস্থ হন। তিনি হচ্ছেন আলী লারিজানি। তিনি দেশটির শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

তারপর থেকে ৬৭ বছর বয়সী লারিজানি কার্যত দেশ চালাচ্ছেন। তিনি অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী গার্ডস কর্পসের সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান। তার উত্থান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে আড়াল করে ফেলেছে।

পেজেশকিয়ান সম্প্রতি কঠিন সময় পার করছেন। তিনি বারবার বলেছেন, আমি ডাক্তার, রাজনীতিবিদ নই। ফলে তিনি ইরানের অসংখ্য সমস্যার সমাধান করবেন— এই আশা করাটা বোকামি।

লারিজানির এই উত্থানের খবর উঠে এসেছে ছয়জন সিনিয়র ইরানি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে। যাদের একজন আয়াতুল্লাহ খামেনির অফিসের সঙ্গে যুক্ত, তিনজন বিপ্লবী গার্ডসের সদস্য এবং দুইজন সাবেক ইরানি কূটনীতিক।

লারিজানির দায়িত্বের পরিধি গত কয়েক মাসে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে তিনি দেশের অভ্যন্তরে অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন।


পাশাপাশি শক্তিশালী মিত্রদের, যেমন— রাশিয়া এবং কাতার ও ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করছেন লারিজানি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় তত্ত্বাবধানও করছেন তিনি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও তৈরি করছেন।

এই মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় আলজাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে লারিজানি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত।’

নিজেদের পূর্বের চেয়ে শক্তিশালী দাবি করেন ইরানের শীর্ষ এই কর্মকর্তা। একইসঙ্গে নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরানো হয়েছে বলে জানান তিনি।


তবে তিনি জানান, তার দেশ যুদ্ধ চায় না। কেউ যদি তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তবে ইরান বসে থাকবে না। অর্থাৎ ইরান প্রস্তুত রয়েছে যুদ্ধের জন্য। তিনি বলেন, ‘গত সাত-আট মাসে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি।’

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলা থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে লারিজানিসহ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীকে কড়া নির্দেশ দেন আয়াতুল্লাহ খামেনি।


শুধু তা-ই নয়, খামেনি নিজে এবং দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর যেকোনো গুপ্তহত্যার চেষ্টা নস্যাৎ করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে তাদের।


ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপনের মিছিলে তেহরানবাসী


সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত বিশ্লেষক নাসের ইমানির মতে, লারিজানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন খামেনি। ফলে এই তীব্র সামরিক ও নিরাপত্তা সংকটের সময় তিনি তার কাছে ফিরেছেন। ফলে যুদ্ধকালে লারিজানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

লারিজানি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবার থেকে এসেছেন। ১২ বছর তিনি সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে তাকে চীনের সঙ্গে ২৫ বছরের বিস্তৃত কৌশলগত চুক্তি নিয়ে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, আয়াতুল্লাহ খামেনি একাধিক নির্দেশনা জারি করেছেন। তিনি নেতৃত্বে থাকা সবাইকে সর্বোচ্চ চারজন বিকল্প নাম দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠীর কাছে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ বিঘ্নিত হলে বা তিনি নিহত হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে আত্মগোপনে থাকার সময় আয়াতুল্লাহ খামেনি তিনজন প্রার্থীকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তারা কখনও প্রকাশ্যে আসেননি। কিন্তু লারিজানি প্রায় নিশ্চিতভাবে তাদের মধ্যে নেই, কারণ তিনি একজন সিনিয়র শিয়া ধর্মগুরু নন।

আয়াতুল্লাহ খামেনি যাদের বিশ্বাস করেন তাদের মধ্যে লারিজানি অন্যতম। আরো রয়েছেন তার সর্বোচ্চ সামরিক উপদেষ্টা এবং বিপ্লবী গার্ডসের সাবেক চিফ কমান্ডার মেজর জেনারেল ইয়াহয়া রহিম সাবাভি। এছাড়াও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকেও খামেনি বিশ্বাস করেন। তিনি বিপ্লবী গার্ডসের সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমান সংসদের স্পিকার, যাকে আয়াতুল্লাহ খামেনি যুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার জন্য ডি ফ্যাক্টো ডেপুটি হিসেবে মনোনীত করেছেন। এছাড়া খামেনির ঘনিষ্ঠ বলয়ে রয়েছে ধর্মগুরু আলী আসগর হেজাজি।

ইরান যে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে তা মূলত পূর্বের ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে। যে যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের উচ্চস্তরের সামরিক কমান্ড চেইন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।


যুদ্ধ থামার পর লারিজানিকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন খামেনি। এরপর একটি নতুন ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিল তৈরি করেন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন অ্যাডমিরাল আলি শামখানি। তিনি যুদ্ধকালীন সময়ে সামরিক বিষয়গুলোর দেখভাল করবেন।

জন হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের ইরান ও শিয়া ধর্মতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ভালী নাসরের মতে, খামেনি সামনে থাকা বাস্তবতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করছেন এবং রাষ্ট্রকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা অনিবার্য এবং আসন্ন ভেবে ইরান এসব প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই পক্ষ যদিও কূটনৈতিকভাবে যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরান তার সকল সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে এবং জোরালোভাবে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলোকে ইরাক সীমান্ত বরাবর স্থাপন করছে যেন ইসরায়েলে আঘাত করা সহজ হয়। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলেও এসব ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা হয়েছে যেন মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সহজে হামলা চালানো যায়।




গত কয়েক সপ্তাহে, ইরান মিসাইল পরীক্ষা করার জন্য মাঝে মাঝে আকাশসীমা বন্ধ করেছে। এছাড়াও তারা পারস্য উপসাগরে সামরিক মহড়া চালিয়েছে এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথ।

এই সময়ে, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এমন একটি থাপ্পড় খাবে, যারপর তারা আর দাঁড়াতে পারবে না।

যুদ্ধ হলে পুলিশ, গোয়েন্দা এজেন্টদের বিশেষ বাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ডসের অধীনস্থ সাধারণ পোশাকধারী বাসিজ বাহিনীর ব্যাটালিয়নগুলো প্রধান শহরের রাস্তায় মোতায়েন করা হবে। এরপর এই বাহিনীগুলো চেকপয়েন্ট স্থাপন করবে যাতে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামলানো যায়।

ইরানের নেতৃত্ব শুধু সামরিক ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রস্তুতি নিচ্ছে না, তারা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি ও শীর্ষ নেতারা যদি নিহত হন, তখন দেশ কে পরিচালনা করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তারা এমন লোকও খুঁজে বের করার কথাও ভাবছেন যিনি ‘ইরানের ডেলসি’ হতে পারেন।

যা ভেনিজুয়েলার উপ-রাষ্ট্রপতি ডেলসি রজরিগেজের প্রতি ইঙ্গিত, যিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন ভেনিজুয়েলা পরিচালনার জন্য।

ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন লারিজানি। তার পরেই আছেন সংসদের স্পিকার জেনারেল গালিবাফ। আশ্চর্যের বিষয়, আরেকজন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানীও সেই তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

গত এক মাসে, সবখানেই লারিজানির উপস্থিতি বেড়েছে। অন্যদিকে কমেছে পেজেশকিয়ানের প্রভাব। সম্প্রতি লারিজানি মস্কো সফরে গিয়েছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে পরামর্শের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠকের মধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন।

তিনি ইরানি ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ইরানিদের সঙ্গে ছবি, মাজার পরিদর্শন বা বিমান থেকে জনগণকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এমন বিষয় নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যেন সব ক্ষমতা লারিজানির হাতে ছেড়ে দিয়ে একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছেন। দেশে কোনো কাজ করতে খোদ প্রেসিডেন্টকেও এখন লারিজানির কাছে ধরনা দিতে হচ্ছে।

ইরানি কর্মকর্তারা জানান, গত জানুয়ারিতে বিক্ষোভ দমনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। আরাগচি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে ফোন করে জানতে চান, তিনি উইটকফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন কি না। জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। অনুমতি নেওয়ার জন্য তাকে লারিজানিকে ফোন করতে বলেন পেজেশকিয়ান।

**ফারনাজ ফাসিহি: দ্য টাইমসের জাতিসংঘের ব্যুরো প্রধান

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত


    শেয়ার করুন: