আগামীর সময়

ইরান যুদ্ধ থেকে লাভের সুযোগ খুঁজছে রাশিয়া

ইরান যুদ্ধ থেকে লাভের সুযোগ খুঁজছে রাশিয়া

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

এক সপ্তাহের মধ্যে টেলিফোনে দুবার কথা বলেছেন রাশিয়া ও ইরানের প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকা ও ইসরায়েল যখন ইরানের উপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তিস্থাপনকারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তবে এটা এত সহজ বিষয় নয়।

কারণ এ নেতাই ২০২২ সালে ইউক্রেনের উপর আগ্রাসনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইউক্রেনের আক্রমণকে জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছিল।

আর এখন ক্রেমলিন ‘ইরান সংঘাতের উত্তেজনা হ্রাস এবং রাজনৈতিক সমাধানের’ আহ্বান জানাচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তার এত নজর থাকলেও নিজের উঠানে ঠিকই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মস্কো।

ইরানের সঙ্গে মস্কোর একটি ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি রয়েছে। মাত্র এই সপ্তাহে পুতিন তেহরানের প্রতি ক্রেমলিনের ‘অটল সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্ব একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির চেয়ে অনেক কম বলেই মনে হচ্ছে।

এই অবস্থায় মস্কো এই সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।

ক্রেমলিন জানায়, সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরান সংকটের দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে কয়েকটি প্রস্তাব ও ভাবনা তুলে ধরেন। এসব প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয় উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতা, ইরানের প্রেসিডেন্ট এবং অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে তার বিভিন্ন যোগাযোগের ভিত্তিতে।

রাশিয়ার জন্য এটি উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান জোরদার করার এবং প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করার একটি সুযোগ। এটি মস্কোর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করারও একটি বড় সুযোগ।

ক্রেমলিন ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধের লক্ষ্যের জন্য উপকারী বলে মনে করে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, পুতিন ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সমালোচনা না করার ব্যাপারে কেন সতর্ক ছিলেন।

সোমবার পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের পর ট্রাম্প বলেছেন, পুতিন সাহায্য করতে চান। আমি বলেছিলাম, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে আপনি আরও সাহায্য করতে পারেন। সেটা আরও সাহায্য করবে।

ক্রেমলিন যখন ইরানে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানাচ্ছে, তখন এই সংঘাত মস্কোর জন্য আরও কিছু সুযোগও তৈরি করছে। সেগুলো হলো অর্থনৈতিক সুযোগ।

বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দামের উল্লম্ফন রাশিয়ার সরকারি আয়ে খুব প্রয়োজনীয় সুবিধা এনে দিয়েছে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকে, তাহলে তা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ  জোগান দিতেও সহায়তা করবে।

রাশিয়ার ফেডারেল বাজেট এমন হিসাব ধরে তৈরি করা হয়েছে যে দেশটি প্রতি ব্যারেল তেল ৫৯ ডলার দামে রপ্তানি করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেলের দাম সেই স্তরের অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। তবে এই সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে কিছুটা কমলেও তেলের দাম এখনো ৫৯ ডলারের অনেক ওপরে রয়েছে।

তাছাড়া, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে আমেরিকা কিছু দেশের উপর তেল-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।

যদি রাশিয়ার উপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়, তাহলে মস্কো আরও বৃহত্তর আর্থিক লাভের আশা করতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, এটি কিয়েভের জন্য একটি গুরুতর আঘাত হবে। তিনি ট্রাম্পকে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ক্রেমলিনপন্থি কমসোমলস্কায়া প্রাভদা সংবাদপত্রকে এ বিষয়ে বেশ আশাবাদী মনে হয়েছে। আজকের সংস্করণে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের শিরোনাম করেছে, ‘ব্যয়বহুল তেল নিষেধাজ্ঞা বাতিলের কারণ’।

ক্রেমলিন হয়তো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করছে না। কিন্তু কিছু রুশ সংবাদপত্র ট্রাম্প এবং ইরান যুদ্ধের সমালোচনা করছে।

মস্কোভস্কি কমসোমোলেটস নামের একটি ট্যাবলয়েড গতকাল মঙ্গলবারের সংস্করণে লিখেছে, ‘পিস প্রেসিডেন্ট একেবারেই পাগল হয়ে গেছেন।’ তারা আরও লিখেছে, সম্রাটের আসলে কিছুই নেই; এমনকি তার সুস্থ বিচারবুদ্ধিও নেই।

স্টিভ রোজেনবার্গ: বিবিসি রাশিয়ার এডিটর

    শেয়ার করুন: